ঢাকার গলিতে গলিতে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা। দোকানের সাইনবোর্ডে মেসির ছবি। রিকশার হুডে আঁকা আলবিসেলেস্তের তারকা। বিশ্বকাপ মৌসুমে বাংলাদেশের রাস্তাগুলো যেন বুয়েনোস আইরেসের কোনো পাড়ায় রূপান্তরিত হয়ে যায়। নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে—যেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মেসির আর্জেন্টিনার জন্য উন্মাদনা “পাগলামির” পর্যায়ে পৌঁছেছে।
কিন্তু কেন? কেন হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত একটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মানুষ, যাদের নিজস্ব ফুটবল দল বিশ্বমঞ্চে তেমন সাফল্য দেখাতে পারেনি, তারা এতটা উন্মাদ হয়ে উঠবেন একটি ল্যাটিন আমেরিকান দলের জন্য?
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ভক্তির শেকড় অনেক গভীরে। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে ডিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ দেখে এই দেশের তরুণ প্রজন্মের মনে আর্জেন্টিনার প্রতি এক অনুরাগ জন্ম নেয়। সেই অনুরাগ পরবর্তীতে লিওনেল মেসির হাত ধরে নতুন মাত্রা পায়।
মেসি যখন বার্সেলোনার হয়ে মাঠ কাঁপাতেন, তখন থেকেই বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীরা তাকে মারাদোনার উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতে শুরু করেন। মেসির বল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা, তার ড্রিবলিং দক্ষতা এবং মাঠে তার নিঃস্বার্থ খেলার ধরন—সবকিছুই বাংলাদেশের তরুণদের মনে আলাদা জায়গা করে নেয়।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রতি বাংলাদেশের ভক্তদের সমর্থন এতটাই আলোচিত হয়ে ওঠে যে আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের অফিসিয়াল টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে বাংলাদেশের ভক্তদের প্রশংসা করে টুইট করা হয়।
আর ২০২৬ বিশ্বকাপ? এবার উন্মাদনা আরও বেড়েছে। ঢাকার শাহবাগ, বরিশালের বেলস পার্ক, চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট—সবখানেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের ঢল নামে। বিশাল পর্দায় ম্যাচ দেখা, জয়ের পর মিছিল, আতশবাজি—এসব যেন নতুন ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।
ঢাকায় হাজার হাজার আর্জেন্টিনা-সমর্থক স্থানীয়রা বিশাল স্ক্রিনের সামনে জড়ো হন এবং জয়ের পর রাস্তায় নেমে পড়েন উৎসবে মাততে।
বাংলাদেশের ফুটবল ভক্তদের মধ্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন নয়। বিশ্বকাপ মৌসুমে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা রূপ নেয় এক ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ ‘যুদ্ধের’। রাস্তায় পাল্টাপাল্টি শোভাযাত্রা, দোকানে দোকানে পতাকার প্রতিযোগিতা—এসব দৃশ্য বাংলাদেশের বিশ্বকাপ উৎসবের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে মেসির আর্জেন্টিনা বরাবরই বাংলাদেশে একটু বেশিই জনপ্রিয়। বিশেষ করে ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এই জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা প্রেম এতটাই বিখ্যাত যে নিজে মেসিও এর কথা জেনেছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমর্থকদের সঙ্গে বসে মেসিদের খেলা দেখেছেন।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা ভক্তদের ছবি ও ভিডিও প্রচারিত হওয়ায় মেসি নিজেও বাংলাদেশের ভক্তদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন বলে জানা যায়।
বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা ভক্তির পেছনে কেবল ফুটবল নয়, একটি প্রজন্মের আবেগ ও পরিচয়ও জড়িত। মেসির মতো একজন খেলোয়াড়, যিনি বারবার হেরেও হার মানেননি, শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জিতেছেন—এই গল্প বাংলাদেশের কোটি তরুণের জন্য অনুপ্রেরণার। তারা মেসিকে দেখেন নিজেদের প্রতিফলন হিসেবে—একজন সাধারণ মানুষ যিনি অসাধারণ কিছু করতে পারেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এই “পাগলামি” শব্দটি হয়তো ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের ভক্তদের উন্মাদনার তীব্রতা বোঝাতে। কিন্তু যারা রাত জেগে ম্যাচ দেখেন, জয়ের পর রাস্তায় নেমে আসেন, মেসির নামে স্লোগান দেন—তাদের কাছে এটি কেবল খেলা নয়, এটি এক জীবনধারা।
২০২৬ বিশ্বকাপ চলাকালীন বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা উন্মাদনা আরও বাড়বে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। মেসির হয়তো এটি শেষ বিশ্বকাপ। তাই বাংলাদেশের ভক্তরা চান, তাদের প্রিয় নায়ককে শেষবারের মতো বিশ্বকাপ জিততে দেখতে। আর সেই জন্যই ঢাকা থেকে বরিশাল, চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী—সবখানেই প্রস্তুতি চলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের এই ফুটবল প্রেমের গল্প প্রকাশিত হওয়ায় বিশ্বের দরবারে আরও একবার প্রমাণিত হলো—ফুটবল সীমানা মানে না, ভাষা মানে না। এটি একটি বিশ্ব ভাষা, যা বাংলাদেশের কোটি মানুষকে আর্জেন্টিনার সঙ্গে যুক্ত করে রেখেছে।