দেলুপির গ্রাম, বাংলাদেশের রূপক

শিল্পকলা একাডেমির হল ভর্তি দর্শক। পর্দায় খুলনার এক প্রত্যন্ত গ্রামের গল্প। কিন্তু সেই গ্রামের প্রতিটি দৃশ্যে যেন প্রতিফলিত হচ্ছে পুরো দেশের রাজনীতি, সংকট আর প্রতিরোধের কাহিনি।

মঙ্গলবার (২৮শে জুলাই) বিকাল সাড়ে পাঁচটা। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তন।

হল উপচে দর্শক। সবার চোখ পর্দার দিকে। পর্দায় ভেসে উঠছে খুলনার পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নের কাদামাখা রাস্তা, ভাঙা বাঁধ, আর বন্যাকবলিত গ্রামের মানুষের মুখ।

কিন্তু এই গ্রামটা শুধু একটা গ্রাম নয়। এই গ্রামটা বাংলাদেশ।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের নির্মিত ‘দেলুপি’ সিনেমার উন্মুক্ত প্রদর্শনী শেষে শুরু হলো ‘জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ভূমিকা’ শীর্ষক সংলাপ। মঞ্চে বসেছেন দেশের চারজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী।

আর দর্শকসারিতে বসে আছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদসহ অনেকে।

সংলাপের শুরুতেই কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ বললেন, দেলুপিকে দুইভাবে দেখা যায়।

“দেলুপিকে আমরা একটি গ্রাম হিসেবে দেখতে পারি, আবার বাংলাদেশ হিসেবেও দেখতে পারি। “যেখানে শাসকের পরিবর্তন ঘটেছে, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।”

তার ভাষ্য, ছবিটি জুলাই-পরবর্তী সময়ের চিহ্ন ধারণ করেছে। সংখ্যালঘুদের অবস্থা, সংস্কৃতিচর্চার অবস্থা—সবই এখানে প্রতিফলিত।

“পরবর্তীকালে আমরা যখন আন্দোলনটাকে দেখতে চাইব, তখন ছবিটা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।”

লেখক ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির বললেন, ছবিটা জুলাই অভ্যুত্থানের ‘মোমেন্টাম ও মিনিং’ ধরার চেষ্টা করেছে।

ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদের কাছ থেকে এলো সবচেয়ে গভীর বিশ্লেষণ।

“দেলুপি খুবই সহজ, সরল ও অকপট,” বললেন তিনি। “কেন্দ্রীভূত যে বয়ান থাকে, তার বাইরে গিয়ে মাইক্রোসোশ্যাল সিচুয়েশন তুলে ধরেছে। অনেক সময় প্রান্ত থেকে সত্যের আরেকটা রূপ দেখা যায়।”

তার মতে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ‘দেলুপি’ মাইক্রোস্কোপিক সূত্রের সন্ধান দিচ্ছে। এটি কোনো গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের কথা বলছে না। বরং সহজ, সত্য, কাদাজলে ভেজা, রোদে পোড়া মানুষের জীবনের ছোট ছোট সহজ সত্য এখানে পাবেন।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিন বললেন, “যেখানে জুলাই অভ্যুত্থান শেষ, সেই সময়ে সিনেমাটি শুরু হয়েছে।” তার ভাষ্য, জুলাইয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে দেলুপিকে ফেলে দেওয়া যাবে না।

“রাষ্ট্র নির্মাণ করতে গেলে পুরাতনকে ফেলে দেওয়া যাবে না। ওই স্বপ্নটা জেন-জিদের মধ্যে ছিল। সেটা সিনেমাতেও বাস্তবে দেখতে পেয়েছি।”

মঞ্চে আমন্ত্রিত হয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বললেন, “আন্দোলন মানুষকে নতুন মানুষে পরিণত করে। হয়তো জাকির চেয়ারম্যানদেরও বদলে দেয়। সেই ইঙ্গিত হয়তো সিনেমায় আছে।”

সিনেমাটির নির্মাণের গল্পটাও কম চিত্তাকর্ষক নয়।

২০২৪ সালের আগস্টে ভদ্রা নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ন। স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতে এগিয়ে আসেন এলাকার মানুষ। খবরটি দেখে দেলুটিতে ছুটে যান তাওকীর, সঙ্গে আরও পাঁচজন।

ইচ্ছা ছিল একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ইচ্ছা রূপ নেয় ফিকশন সিনেমায়।

“তখনো আমাদের মাথায় সিনেমার গল্পটা ছিল না,” বললেন তাওকীর। “ধীরে ধীরে দেলুটির মানুষের সঙ্গে মিশতে থাকি। এরই মধ্যে সিনেমার গল্প লিখতে শুরু করি।”

তিনি দেলুপির গল্প পাওয়াকে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার সঙ্গে তুলনা করলেন। “বড়শি ফেলেছিলাম, তবে মাছ টোপ গিলবে কি না, নিশ্চিত ছিলাম না। শেষ পর্যন্ত মাছটি ধরা পড়ে।”

বরাবরই স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেন তাওকীর। দেলুপিতেও দেলুটির মানুষেরাই অভিনয় করেছেন—চিরঞ্জিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, জাকির হোসেনসহ অনেকে।

“সিনেমাতে আসলে তারাও চরিত্র হয়ে যেতে পারে, গল্প হয়ে যেতে পারে, এটা তো আসলে তাদের ধারণার বাইরে ছিল,” বললেন তাওকীর। “তাদের সঙ্গে দিনের পর দিন কাটিয়েছি, ধীরে ধীরে বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি করেছি।”

গত বছরের সেপ্টেম্বরের শেষভাগে দেলুটিতে শুটিং শুরু, অক্টোবরের শেষভাগে শেষ।

সারা দেশে মুক্তির আগে সিনেমাটি দেলুটির মানুষকে দেখাতে চেয়েছিলেন তাওকীর। দেলুটি ইউনিয়নের দারুণ মল্লিক প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে হয় সিনেমাটির প্রিমিয়ার শো ।

“দর্শক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বসে ছিল। দর্শক হাসছে, কাঁদছে আবার নিজেকে লুকাচ্ছেও,”। “সিনেমাটি যে কেউ হজম করতে পারবে।”

‘দেলুপি’ শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সাড়া ফেলেছে। রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়েছে।

আর সম্প্রতি ছবিটি প্রশংসা পেয়েছে বলিউডের খ্যাতিমান নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপের কাছ থেকে।

চলচ্চিত্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ‘লেটারবক্স’-এ অনুরাগ কাশ্যপ লিখেছেন, “ক্ষমতার রাজনীতি যে কত ক্ষুদ্র স্তরেও কাজ করে, সেটাই দেখা যায় ‘দেলুপি’ গ্রামের গল্পে। শাসনব্যবস্থা বদলের পর বন্যায় দেশের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ছোট্ট এই গ্রাম। গল্পটা এতটাই মানবিক যে মনে হয় যেন আমাদের নিজেরই পাশের গ্রামের গল্প দেখছি।”

দর্শক সিনেমাটি কেন দেখবেন?

তাওকীরের উত্তর, “৫ আগস্টের পর থেকে আমরা যেসব অস্থিরতার মধ্যে আছি আর যেসব কোয়েশ্চেন ফেস করছি, যেটার পুরোনো কনসিকোয়েন্সেস আছে এবং বর্তমান কনসিকোয়েন্সেস আছে, এই দুইটা জিনিসই ছবিটার মধ্যে খুব ভালোমতো আছে।”

তার ভাষ্য, “এটা আমাদের সবার ইউনিটির গল্প, যেখানে সবাই মিলে ইউনিটিটা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে এবং ফাইনালি সমস্যাগুলো আমাদের সলভ করতে হবে।”

সিনেমার প্রদর্শনী ও সংলাপের আয়োজক ওয়ার্ল্ড সিনে সার্কেল, সিনেফিল সোসাইটি বাংলাদেশ এবং সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটি।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নুর উল্লাহ।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন শাহানূর আক্তার চৌধুরী (সহ-সভাপতি, ওয়ার্ল্ড সিনে সার্কেল), আশরাফ রনি (সভাপতি, সিনেফিল সোসাইটি বাংলাদেশ) এবং ফারুক হোসেন খান (সভাপতি, সুন্দরবন ফিল্ম সোসাইটি)।

জাতীয় নাট্যশালার হল থেকে বেরিয়ে আসার পরও দর্শকদের মনে থেকে যায় দেলুপির কাদামাখা রাস্তা, ভাঙা বাঁধ, আর বন্যাকবলিত গ্রামের মানুষের মুখ।

কারণ দেলুপি শুধু একটা গ্রামের গল্প নয়। এটা পুরো বাংলাদেশের গল্প। যেখানে বাঁধ শুধু একটা বাঁধ নয়, এটা রাষ্ট্রের প্রতীক। যেখানে বন্যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা রাজনৈতিক অস্থিরতার রূপক।

আর যেখানে গ্রামের মানুষ মিলে বাঁধ বাঁধছে, সেটা আসলে পুরো দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা।

দেলুপি কোনো সহজ উত্তর দেয় না। বরং প্রশ্ন তোলে—উন্নয়ন কাদের জন্য? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়? আর সংকটের সময় মানুষ কীভাবে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়তো দেলুপির গ্রাম থেকে আমরা আমাদের নিজেদের গ্রামকে, আমাদের নিজেদের দেশকে চিনতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *