মাঠ থেকে পাট হারিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু একটা ফসলের পতন নয়, এটা একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মৃত্যু।
সাব্বির হোসেন
লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলা। সকাল নয়টা।
রফিকুল ইসলাম তার দুই বিঘা জমির পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। গত বছর এই জমিতে ছিলো সবুজ পাট গাছ। বাতাসে দুলছিল সোনালী আঁশের স্বপ্ন। সেই জমিতে এবার ভুট্টা আর ধান।
রফিকুলের বয়স ৫৫। সারাজীবন পাট চাষ করেছেন। কিন্তু এবার আর পাটের দিকে যাননি। কেন?
তার কথায়—”গত বছর দুই বিঘা জমিত পাট খাড়িসিনু। পাট পচাবার মতো কোনো পানি পাও নাই, শেষত দূরে নিয়া যাইয়া জাগ দেওয়া লাগছে। বিক্রি করিয়া খোরচা-ই উঠে নাই। তাই এবা আর পাটের দিকে যাই নাই, ওটে ভুট্টা আর ধান নাগাইছি।”
রফিকুল একা নন। পুরো লালমনিরহাট জুড়ে এখন এই একই চিত্র।
একসময় লালমনিরহাটের মাঠের পর মাঠ সবুজ পাট গাছে ছেয়ে থাকত। সোনালী আঁশ ছিল এই জেলার পরিচয়।
কিন্তু এবার? পাটের ক্ষেত খোঁজা দায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ মৌসুমে জেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩,৮৫০ হেক্টর। অর্জিত হয়েছিল ৩,৭২০ হেক্টর। ২০২৩-২৪ মৌসুমে সেই জমি কমে দাঁড়াল ২,৪০০ হেক্টরে।
আর চলতি মৌসুমে? কৃষি বিভাগ ১,৮০০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বাস্তবে চাষ হয়েছে ৩০০ হেক্টরেরও কম। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এটাই সর্বনিম্ন। কেন এই ধস?
স্থানীয় কৃষিবিদ ও কৃষকদের সাথে কথা বলে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা গেছে।
প্রথমত, উৎপাদন খরচের বিপুল বৃদ্ধি। ডিজেল, সার আর কৃষি শ্রমিকের মজুরি অস্বাভাবিক বেড়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে পাট উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা।
দ্বিতীয়ত, পানির অভাব ও পাট পচানোর সংকট। সঠিক সময়ে বৃষ্টি না হওয়ায় পাটের রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। খাল-বিল আর জলাশয় শুকিয়ে যাওয়ায় পাট পচানোর (জাগ দেওয়া) তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে।
তৃতীয়ত, ন্যায্যমূল্যের অভাব। বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি করতে হচ্ছে ২,০০০ থেকে ২,২০০ টাকায়। যেখানে প্রতি মণ পাটের উৎপাদন খরচ পড়ছে প্রায় ২,৫০০ টাকা।
মানে, প্রতি মণে কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। প্রতি বিঘাতে লোকসান।
পাট চাষের এই ধারাবাহিক পতন শুধু একটা ফসলের সমস্যা নয়। এটা জেলার পরিবেশ আর কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকির বার্তা। সোনালী আঁশের এই সোনালী ঐতিহ্য ধরে রাখতে না পারলে জেলার পাটভিত্তিক শিল্প আর প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেন, “আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পাট পচানোর জলাশয়ের ঘাটতি কৃষকদের অন্য ফসলে উৎসাহিত করছে। পাট চাষে কৃষকরা ভুট্টা ও সবজির দিকে ঝুঁকছেন।”
তিনি আরও জানান, “আমরা আধুনিক রিবন রেটিং (ফিতা ফানেল) পদ্ধতিতে পাট পচানোর প্রশিক্ষণ দিচ্ছি এবং কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার পরিকল্পনা করছি, যাতে সোনালী আঁশের ঐতিহ্য লালমনিরহাট থেকে হারিয়ে না যায়।”
কিন্তু কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং সরকারিভাবে পাট ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা না করলে আগামী দিনে লালমনিরহাটের মানচিত্র থেকে পাট চাষ পুরোপুরি মুছে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফিরে আসি রফিকুল ইসলামের সেই দুই বিঘা জমিতে।
সে এখন ভুট্টা আর ধান চাষ করছেন। কারণ ভুট্টা আর ধানে অন্তত খরচা উঠে যায়। পাটে? পাটে তো লোকসান।
রফিকুলের বাবা পাট চাষ করতেন। রফিকুল পাট চাষ করতেন। কিন্তু রফিকুলের ছেলে? সে কি পাট চাষ করবে?
সম্ভবত না।
কারণ সোনালী আঁশ এখন আর সোনালী নয়। এখন সেটা শুধুই একটা অতীতের স্মৃতি।
লালমনিরহাটের মাঠ থেকে পাট হারিয়ে যাচ্ছে। আর সাথে হারিয়ে যাচ্ছে একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, একটা জীবনযাত্রা, একটা প্রজন্মের স্বপ্ন।
রফিকুলের জমি এখন শুধু একটা জমি নয়। এটা পুরো বাংলাদেশের কৃষির গল্প। যেখানে কৃষকরা প্রতিদিন লোকসান গুনছেন, আর সরকারি নীতি নির্ধারকরা শুধু পরিসংখ্যান দেখছেন।
সোনালী আঁশের এই সোনালী অতীত কি আবার কখনো সোনালী ভবিষ্যৎ হবে?
নাকি চিরকালের জন্য হারিয়ে যাবে বাংলার মাঠ থেকে?