গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি অবকাঠামো বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ

টোকিওতে এলএনজি প্রোডিউসার-কনজুমার কনফারেন্সে বাংলাদেশের জ্বালানি পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

টোকিওতে অনুষ্ঠিত ১৫তম এলএনজি প্রোডিউসার-কনজুমার কনফারেন্সে বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ, এলএনজি আমদানি এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি অবকাঠামোর পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, এমপি।

জাপানের টোকিওর দ্য ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত সম্মেলনের এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অ্যাডভান্সিং এলএনজি ফর দ্য ফিউচার: রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিলায়েবিলিটি’। সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার বর্তমান পরিস্থিতি, গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তার ধারণা এখন শুধু জ্বালানি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরবরাহের বৈচিত্র্য, সাশ্রয়ী মূল্য এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতাও জরুরি।

বাংলাদেশে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহারও বাড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সার কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাসের ওপর দেশের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।

তবে দেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দিয়ে এই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি বাংলাদেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউর মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশের বার্ষিক এলএনজি চাহিদা প্রায় ৭ মিলিয়ন টন।

চাহিদা আরও বাড়বে ধরে নিয়ে নতুন অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালের মধ্যে মহেশখালীতে আরও একটি এফএসআরইউ চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। এর সক্ষমতা হবে প্রতিদিন ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এর পর ২০৩০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ীতে ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতার একটি ল্যান্ড-বেসড এলএনজি টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের এলএনজি সক্ষমতা বা চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন টন বার্ষিক সরবরাহ যুক্ত হতে পারে। ২০৩১ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে এই পরিমাণ ১৭ থেকে ১৮ মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

শুধু অবকাঠামো বাড়ানো নয়, এলএনজি সংগ্রহের উৎসও বৈচিত্র্যময় করার কথা তুলে ধরেছেন প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানান, সরকার জি-টু-জি চুক্তি, আন্তর্জাতিক দরপত্র বা আরএফকিউ এবং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএম-এর মাধ্যমে বিভিন্ন উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহ করছে। এর লক্ষ্য হলো কোনো একটি উৎস বা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো।

আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সরকার বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি।

এর সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের সুযোগও সামনে আনেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি ‘বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড ২০২৬’-এর কথা উল্লেখ করেন। এই বিডিং রাউন্ড ৩০ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত উন্মুক্ত রয়েছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বিনিয়োগকারীদের জন্য মুনাফা স্থানান্তরের সুযোগ, কর পরিশোধে সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব স্থিতিশীলতার মতো সুবিধা রাখার কথা জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য শুধু আমদানি বাড়ানো নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

টোকিওর সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে চায়।

বন্ধুভাবাপন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয়ও জানান তিনি।

বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় এলএনজির গুরুত্ব যে আগামী বছরগুলোতে আরও বাড়তে যাচ্ছে, সরকারের এই পরিকল্পনাগুলো তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়তে থাকা আমদানি-নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং নতুন অবকাঠামোর বিনিয়োগ ব্যয়—এসব বিষয়ও দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *