উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আলজেরিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ই সেপ্টেম্বর) আলজেরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
আলজেরিয়ার সরকারি টেলিভিশনের বরাত দিয়ে রয়টার্সও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
তবে সম্পর্ক ছেদের পেছনে কোনো একটি নির্দিষ্ট ঘটনার কথা উল্লেখ করেনি আলজেরিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুধু বলেছে, ইউএই-এর ‘উসকানিমূলক ও শত্রুতাপূর্ণ’ কর্মকাণ্ড এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা আর মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, দুই দেশের সম্পর্ক রক্ষার সব ধরনের পথ শেষ হয়ে যাওয়ার পরই তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ইউএই অবশ্য আলজেরিয়ার সিদ্ধান্তকে স্থায়ী ধরে নিতে চাইছে না। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তারা দুই দেশের জনগণের সম্পর্ক এবং পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইউএই প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত যুক্তি, যোগাযোগ এবং স্বার্থের স্বচ্ছতা—‘ধাঁধা বা সংকেত’ নয়।
আলজেরিয়া ও ইউএই-এর মধ্যে বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্ন। আলজেরিয়া দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে আসছে। বিপরীতে, ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় করা আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইউএই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে।
একই সময়ে ইউএই-এর ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক অংশীদার মরক্কোও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। বিষয়টি আলজেরিয়ার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মরক্কোর সঙ্গে দেশটির দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে।
দুই দেশের বিরোধের আরেকটি বড় ক্ষেত্র পশ্চিম সাহারা। মরক্কো পশ্চিম সাহারার ওপর নিজের সার্বভৌমত্বের দাবি করে। ইউএই সেই অবস্থানকে সমর্থন করেছে এবং পশ্চিম সাহারায় একটি কনস্যুলেটও খুলেছে।
অন্যদিকে, আলজেরিয়া পশ্চিম সাহারার স্বাধীনতার দাবিতে লড়াই করা পলিসারিও ফ্রন্টকে সমর্থন করে। ফলে এই ইস্যুতে আলজেরিয়া ও ইউএই কার্যত দুই বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
সাহেল অঞ্চল নিয়েও দুই দেশের স্বার্থের পার্থক্য বাড়ছে। সাহারা মরুভূমির দক্ষিণে বিস্তৃত এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিরাপত্তা, সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও উপসাগরীয় শক্তি।
ইউএইও এই অঞ্চলে নিজেদের যোগাযোগ ও প্রভাব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, আলজেরিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের বেশ কয়েকটি দেশে সামরিক অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে দেশটির নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে সাহেলকে ঘিরে দুই দেশের কৌশলগত হিসাবও ক্রমে ভিন্ন হয়ে উঠেছে।
আলজেরিয়ায় ইউএই-এর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা নতুন নয়। দেশটির গণমাধ্যমে আবুধাবির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা তৈরি এবং আলজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগও এসেছে।
গত বছর আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেলমাজিদ তেব্বুনে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে আলজেরিয়ার সম্পর্ক উষ্ণ—‘একটি দেশ’ ছাড়া। তখন অনেকেই ওই মন্তব্যকে ইউএইকে ইঙ্গিত করে করা বলে মনে করেছিলেন।
আলজেরিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম দেশ এবং ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী। বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে ইউরোপের সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
অন্যদিকে, ইউএই মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি। আফ্রিকাতেও দেশটির বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক উপস্থিতি গত কয়েক বছরে বেড়েছে।
তাই দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার প্রভাব শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পশ্চিম সাহারা ও সাহেল অঞ্চলে এর প্রভাব পড়তে পারে। উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভাজনও আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তবে ইউএই আলজেরিয়ার সিদ্ধান্তকে সাময়িক বলে আশা প্রকাশ করেছে। এর অর্থ হলো, কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এখনো উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
তারপরও, আলজেরিয়া ও ইউএই-এর মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের প্রকাশ্য বিরোধ উত্তর আফ্রিকার ভূরাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আগামী দিনে এই বিরোধ কতটা গভীর হয়, নাকি পর্দার আড়ালে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে।