১০ জেলায় ৭৫ হাজার বৃক্ষরোপণ করেছে সিজিইডি

১০ জেলায় সিজিইডির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে চারা রোপণ করা হচ্ছে।

উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজীর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সামনে রেখে চলতি বছর দেশের ১০টি জেলায় প্রায় ৭৫ হাজার বৃক্ষরোপণ করেছে সেন্টার ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিজিইডি)। রোপণ করা এসব গাছের মধ্যে রয়েছে ফলজ, বনজ ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী বিভিন্ন প্রজাতি।

সিজিইডির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ড.মো: আব্দুল ওয়াহাব বলছেন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা নয়; গ্রামীণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও গাছকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা।

গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন উৎপাদন করে। একই সঙ্গে গাছ মাটি ও পানি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল তৈরি এবং স্থানীয় পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বন ও বৃক্ষ আচ্ছাদন বায়ু থেকে বিভিন্ন দূষণকারী কণা ও কিছু দূষক কমাতেও সহায়তা করে। বড় আকারের বৃক্ষরাজি ছায়া তৈরি করে এবং নগর ও গ্রামীণ উভয় পরিবেশেই অতিরিক্ত তাপের প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখে।

বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রেও উদ্ভিদের ভূমিকা রয়েছে। গাছপালা থেকে জলীয়বাষ্প নির্গমনের মাধ্যমে স্থানীয় জলচক্রে অবদান রাখে এবং বড় বনাঞ্চল আঞ্চলিক জলবায়ু ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শুধু গাছ লাগানোর কারণেই মেঘ বা বৃষ্টি হবে—এমন সরল সম্পর্ক বৈজ্ঞানিকভাবে দাবি করা যায় না।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলাতেও বৃক্ষরোপণ গুরুত্বপূর্ণ। গাছের দেহ ও মাটিতে কার্বন সঞ্চয়ের মাধ্যমে বন ও বৃক্ষভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র বায়ুমণ্ডলের কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

সিজিইডির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি করা। রোপণ করা ফলজ ও বনজ গাছ ভবিষ্যতে ফল, কাঠ, পাতা ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করতে পারে। এসব সরাসরি পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহারের পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আয় করার সুযোগও তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বৃক্ষসম্পদ ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার একটি উৎস হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

তবে এই সুফল পেতে হলে শুধু চারা রোপণ করাই যথেষ্ট নয়। গাছের প্রজাতি নির্বাচন, স্থানীয় মাটি ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য, নিয়মিত পরিচর্যা এবং কয়েক বছর ধরে চারার টিকে থাকার হার পর্যবেক্ষণ—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি রাজশাহী অঞ্চলে প্রায় এক হাজার তালের চারা রোপণের কর্মসূচি শুরু করেছে সিজিইডি। কর্মসূচির প্রাথমিক পর্যায়ে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।

সিজিইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, রুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আবদুর রাজ্জাক, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, সরকারি সার্ভে ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলাম এবং রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সচিবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বক্তারা পরিবেশ রক্ষায় তালগাছ রোপণের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় তালগাছের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তারা আরও বেশি করে তালগাছ লাগানোর আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে তালগাছকে দীর্ঘদিন ধরেই বজ্রপাতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি প্রতীকী বৃক্ষ হিসেবে দেখা হয়। উঁচু গাছ হিসেবে তালগাছ বজ্রপাতের সময় বৈদ্যুতিক নির্গমনের সম্ভাব্য পথের অংশ হতে পারে। তবে তালগাছ লাগালেই বজ্রপাত থেকে মানুষ নিরাপদ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা বৈজ্ঞানিকভাবে দেওয়া যায় না।

বজ্রপাত থেকে মানুষের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো বজ্রপাতের পূর্বাভাস ও সতর্কতা অনুসরণ করা, ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং খোলা মাঠ, গাছের নিচে কিংবা জলাশয়ের কাছে অবস্থান না করা। তাই তালগাছের পরিবেশগত ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব থাকলেও এটিকে বজ্রপাত প্রতিরোধের একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সিজিইডির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমে বিভিন্ন স্থানীয় ও সহযোগী সংগঠন অংশ নিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার ইনিশিয়েটিভ, আসমানী ফাউন্ডেশন, ইউএসটি, ফুলবাড়ী প্রেস ক্লাব, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য ফোরাম, বিকশিত বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, যুব কল্যাণ নারী উন্নয়ন সংস্থা এবং ক্লাইমেট নেটওয়ার্ক (সিএন)।

বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে সফল করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে গাছগুলোর পরিচর্যাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃক্ষ আচ্ছাদন কমে যাওয়া, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মধ্যে নতুন করে বৃক্ষরোপণ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি সফল বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কয়েক বছর পর—কতটি চারা টিকে থাকল, কতটা বড় হলো এবং স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনে কী ধরনের পরিবর্তন আনল, তার ওপর।

সেই জায়গায় ১০ জেলায় ৭৫ হাজার গাছ লাগানোর উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিটি চারার বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠার তথ্য সংরক্ষণ করা হলে কর্মসূচিটির পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *