ফেসবুকভিত্তিক প্রতারক চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার

ফেসবুকে ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’ পরিচয়ে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে পুঁজি করে অভিনব কৌশলে প্রতারণা চালানো একটি সংঘবদ্ধ চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তে উঠে এসেছে, ‘জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান’ এবং ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ঠিক করে দেওয়ার’ প্রলোভন দেখিয়ে তারা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের পাশাপাশি রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শারীরিক ক্ষতও সৃষ্টি করত।

পিবিআই জানিয়েছে, এই চক্রের প্রতারণার একই কৌশলে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গত কয়েক মাসে অন্তত ২০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

মামলার বাদী মোছা. সালমা আক্তার ফেসবুকে ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ‘হাদিয়া’ বাবদ ১,৫০০ টাকা এবং পরে ‘জালালী কবুতর’ কেনার কথা বলে আরও ৩,৫০০ টাকা বিকাশে নেওয়া হয়।

এরপর কথিত তান্ত্রিক দাবি করেন, জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হবে। এজন্য সালমা আক্তারকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনে ইমু ভিডিও কলে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবহার করতে বলা হয়।

নির্দেশনা অনুসরণ করার পর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় তার বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে সেই ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬ হাজার টাকা নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রতারকরা তার কাছ থেকে ২১ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে।

এ ঘটনায় সালমা আক্তার খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় মামলা করেন। মামলাটি পরে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) তদন্তের দায়িত্ব নেয় এবং এসআই (নিঃ) মো. নাজমুল হককে তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

পিবিআই জানায়, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে ২৪শে জুলাই গভীর রাতে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) ও মাহে আলম (২৭)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড জব্দ করা হয়েছে।

একই দিন সকালে নোয়াখালীর সুধারাম উপজেলার পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে মো. হাসান আলী (২০)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছ থেকেও একটি মোবাইল ফোন ও একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

পিবিআই জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনজনই প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পরে অহিদ মিয়া ও মো. হাসান আলী আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তান্ত্রিক কবিরাজ’, ‘হোসেন কবিরাজ’, ‘আসমা কবিরাজ’ ও ‘রহমত আলী কবিরাজ’ নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করত।

প্রথমে তারা বিভিন্ন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দিয়ে বিশেষ করে নারীদের আস্থা অর্জন করত। এরপর পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালু বা নাভিতে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে বলত। এতে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গুরুতর ক্ষত তৈরি হতো।

এরপর সেই ক্ষত ‘জ্বীনের মাধ্যমে’ সারিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে আরও টাকা আদায় করা হতো। টাকা নেওয়ার পর ভুক্তভোগীদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিত প্রতারকরা।

পিবিআইর তদন্তে আরও জানা গেছে, চক্রটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, ভারতেও একই ধরনের ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা করত। ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের নামে মানুষের কাছ থেকে গুগল পে -এর মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করা হতো। পরে হুন্ডির মাধ্যমে সেই অর্থ বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করা হতো।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, ভুয়া তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তারা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত ফেসবুক পেজ বুস্ট করত।

আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েতের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে স্থানান্তরের প্রমাণ পেয়েছে পিবিআই।

এছাড়া মাহে আলম তার নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত বিকাশ সিম ব্যবহার করে প্রধান অভিযুক্তকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

পিবিআই এসআইঅ্যান্ডওর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী সাধারণ মানুষকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ বা অলৌকিক সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করেন।

পিবিআই জানিয়েছে, এই প্রতারক চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্তও চলমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *