বিশ্ব বাঘ দিবস: বেড়েছে বাংলাদেশের রয়েল বেঙ্গল টাইগার

২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। পৃথিবীর অন্যতম আকর্ষণীয় ও শক্তিশালী প্রাণী বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতেই প্রতি বছর দিনটি পালন করা হয়। বাংলাদেশের জন্য এবারের বাঘ দিবসের একটি ইতিবাচক দিক হলো, সর্বশেষ জাতীয় বাঘশুমারিতে সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বেড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সুন্দরবনে বন্য পরিবেশে ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।

একসময় ধারাবাহিকভাবে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তবে সর্বশেষ শুমারির ফলাফল আশা জাগিয়েছে। বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ শিকার নিয়ন্ত্রণ, আবাসস্থল রক্ষা এবং কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থার কারণে এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু বাংলাদেশের জাতীয় গৌরবের প্রতীক নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম পরিচিত বাঘের উপপ্রজাতি। সুন্দরবনের লবণাক্ত ম্যানগ্রোভ বনই এদের প্রধান আবাসস্থল। পৃথিবীর অন্য কোথাও এত বড় ম্যানগ্রোভ বনে স্থায়ীভাবে বাঘের বসবাস নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জোয়ার-ভাটার প্রভাব, লবণাক্ত পানি, কাদাময় ভূমি এবং খাদ্য সংগ্রহের কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে হওয়ায় সুন্দরবনের বাঘকে বিশ্বের সবচেয়ে অভিযোজনক্ষম বাঘগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

একসময় এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাঘের বিচরণ ছিল। বর্তমানে বন্য পরিবেশে বাঘ টিকে আছে মাত্র ১০টি দেশে। দেশগুলো হলো—

  • বাংলাদেশ – ১২৫টি
  • ভারত – ৩ হাজার ৬৮২টি
  • ভুটান – ১৩১টি
  • নেপাল – ৩৫৫টি
  • রাশিয়া – ৫৮৬টি
  • থাইল্যান্ড – ২০১টি
  • ইন্দোনেশিয়া (সুমাত্রা) – প্রায় ৩৯৩টি
  • মালয়েশিয়া – প্রায় ১৫০টি
  • চীন – প্রায় ৬০টি
  • মিয়ানমার – নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী কয়েক ডজন থেকে শতাধিকের কম; সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

সংরক্ষণবাদীরা জানান, ভিয়েতনাম, লাওস ও কম্বোডিয়ায় কার্যত আর বন্য বাঘ নেই। একসময় এ দেশগুলোও বাঘের আবাসস্থল ছিল।

গত একশ বছরে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হয়েছে বাঘের একাধিক উপপ্রজাতি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বালি টাইগার, জাভান টাইগার ও কাস্পিয়ান টাইগার। দক্ষিণ চীনের বাঘও বন্য পরিবেশে কার্যত বিলুপ্ত বলে ধরা হয়।

বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে শুধু সুমাত্রান টাইগার টিকে আছে। এটি জীবিত বাঘের উপপ্রজাতিগুলোর মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোট।

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বন্য বাঘ রয়েছে ভারতে। ২০০৬ সালে দেশটিতে বাঘের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪১১। সর্বশেষ সরকারি শুমারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৬৮২। গত দুই দশকে ধারাবাহিক সংরক্ষণ কার্যক্রম, সংরক্ষিত বনাঞ্চল সম্প্রসারণ এবং অবৈধ শিকার দমনের ফলে এই সাফল্য এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বাঘের সবচেয়ে বড় হুমকি এখন জলবায়ু পরিবর্তন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন এবং সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন বাঘের আবাসস্থলকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এর পাশাপাশি অবৈধ শিকার, বনজ সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাতও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বন বিভাগ মনে করছে, কার্যকর সংরক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের বাঘের সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব। এজন্য সুন্দরবনের আবাসস্থল রক্ষা, অবৈধ শিকার সম্পূর্ণ বন্ধ, বনজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বন্য পরিবেশে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের কিছু বেশি। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার শুধু একটি দেশের সম্পদ নয়, বরং বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্ব বাঘ দিবসে তাই প্রশ্ন একটাই—এই অমূল্য প্রাণীকে টিকিয়ে রাখতে আমরা কি আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারব?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *