রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ

রাষ্ট্রায়ত্ত ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত করার সরকারি উদ্যোগের প্রতিবাদে রাজধানীর মতিঝিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট। মঙ্গলবার (২৮শে জুলাই) সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে সংগঠনটির নেতারা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিক্রি বা দীর্ঘমেয়াদি ইজারার পরিকল্পনা বাতিল করে সেগুলো আধুনিকায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনাতেই পুনরায় চালুর দাবি জানান।

সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি করপোরেশনের অধীন ৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন বিনিয়োগ মডেলের আওতায় বেসরকারি খাতের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের দাবি, একই দিনে শিল্প মন্ত্রণালয়ে বিডা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে এ বিষয়ে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এর প্রতিবাদেই এই বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

বক্তারা বলেন, ‘বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন’, ‘দীর্ঘমেয়াদি ইজারা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’ কিংবা ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’—যে নামেই উদ্যোগটি উপস্থাপন করা হোক না কেন, এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।

তাদের ভাষ্য, সরকার এই উদ্যোগকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরলেও এটি মূলত বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-সমর্থিত দীর্ঘদিনের বেসরকারিকরণ নীতির ধারাবাহিকতা। বক্তাদের দাবি, রাষ্ট্রকে উৎপাদন ও শিল্প পরিচালনা থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দিয়ে বেসরকারি পুঁজির সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার একটি নীতির অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সমাবেশে নেতারা আরও বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের অভাব, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন না করা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতিগত অবহেলার কারণে দুর্বল করে তোলা হয়েছে। এরপর লোকসানের অজুহাতে সেগুলো বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে বলে তারা অভিযোগ করেন।

তাদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট ভূমি এবং অবকাঠামো জাতীয় সম্পদ। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই এসব সম্পদের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে তারা মন্তব্য করেন।

সমাবেশ থেকে কয়েকটি দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করা, প্রস্তাবিত ৪৪টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা, সম্পদের মূল্যায়ন ও সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত প্রকাশ করা, শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের অংশগ্রহণে জাতীয় আলোচনা আয়োজন এবং বন্ধ চিনিকল, পাটকলসহ অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান আধুনিকায়নের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পুনরায় চালুর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় শিল্পনীতি প্রণয়ন।

সমাবেশে বক্তারা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষায় বৃহত্তর গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত বন্ধ চিনিকল আধুনিকায়ন ও পুনরায় চালুর দাবিতে চিনিকল সংগ্রাম কমিটির ঘোষিত আগামী ১০ আগস্ট ঢাকায় সমাবেশ ও স্মারকলিপি কর্মসূচির প্রতিও সমর্থন জানান।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের সমন্বয়ক ও বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফি রতন, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য করিম সিকদার, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের নেতা অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাসদ (মাহবুব)-এর সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশীদ ভূঁইয়া, বাসদ (মার্কসবাদী)-এর সমন্বয়ক মাসুদ রানা, জাতীয় গণফ্রন্টের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক রজত হুদা, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *