টিএসএমসি-নির্ভর এআই উন্মাদনায় ঝুঁকির কেন্দ্রে তাইওয়ানের শেয়ারবাজার

আনোয়ার পারভেজ

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যে বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম তাইওয়ান। আর এই উত্থানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানী ( টিএসএমসি )। তবে এআই খাতের এই সাফল্যের পাশাপাশি তাইওয়ানের শেয়ারবাজারে তৈরি হয়েছে নতুন এক ঝুঁকি, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই চিপের বৈশ্বিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় টিএসএমসি-র শেয়ারের দাম এবং মুনাফা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এনভিডিয়া, এপল এবং এএমডি-এর মতো কোম্পানিগুলো তাদের উন্নত চিপ উৎপাদনের জন্য টিএসএমসি-এর ওপর নির্ভরশীল।

এই প্রবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে তাইওয়ানের পুঁজিবাজারেও। বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক হারে ঋণ নিয়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। বিশেষ করে মার্জিন ট্রেডিং বা ঋণভিত্তিক শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শেয়ারের দাম হঠাৎ কমতে শুরু করলে ঋণ পরিশোধের চাপ বড় ধরনের বিক্রির ঢেউ সৃষ্টি করতে পারে।

তাইওয়ানের শেয়ারবাজারের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো প্রযুক্তি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। বাজারের একটি বড় অংশ টিএসএমসি এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পারফরম্যান্সের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে একটি খাতে ধাক্কা লাগলে পুরো বাজারই প্রভাবিত হতে পারে।

এদিকে ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, নতুন নিষেধাজ্ঞা কিংবা তাইওয়ান প্রণালী ঘিরে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিলে তা বাজারে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা অতীতের বড় বাজার বুদবুদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। কেউ কেউ জাপানের ১৯৮০-এর দশকের সম্পদ বুদবুদ কিংবা ২০০০ সালের ডট-কম বুমের সঙ্গে এর তুলনা করছেন। যদিও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে বর্তমান পরিস্থিতির মৌলিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, তবুও অতিরিক্ত ঋণনির্ভর বিনিয়োগ বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

একজন বাজার বিশ্লেষকের ভাষায়, “টিএসএমসি নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যখন একটি দেশের শেয়ারবাজার একটি মাত্র খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা ঋণ নিয়ে সেই খাতে ঝুঁকে পড়েন, তখন সামান্য সংশোধনও বড় ধরনের অস্থিরতার কারণ হতে পারে।”

এআই বিপ্লবের ফলে তাইওয়ানের অর্থনীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে এবং টিএসএমসি বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশটির পুঁজিবাজারে ঝুঁকির মাত্রাও বেড়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি যেমন সম্ভাবনাময় সুযোগের ক্ষেত্র, তেমনি বাজার ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সতর্ক থাকারও সময়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *