যখন সহিংসতাই হয়ে ওঠে বিচার

দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিশোধে স্বামীকে নৃশংস খুনের খবরে হাজার হাজার  ‘লাইক’ ও ‘লাভ’ রিয়্যাক্ট। এটা কি ন্যায়বিচারের দাবি, নাকি আমাদের সমাজের ভায়োলেন্স বা সহিংসতার প্রতি লালিত এক গভীর আকাঙ্ক্ষা?

রাত দুইটা। ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করছেন আপনি।

হঠাৎ একটা পোস্ট। একজন নারী স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ের প্রতিশোধে তার পুরুষাঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।

স্বাভাবিকভাবেই আপনি শিউরে উঠবেন। কিন্তু তারপরই চোখ যায় পোস্টের নিচে।

রিঅ্যাক্ট পড়েছে ১১ হাজার। এর মধ্যে ৮ হাজার ২০০-এর বেশি হলো ‘লাইক’ এবং ‘লাভ’।

আপনি আরও নিচে স্ক্রল করেন। কমেন্ট সেকশন। বিপুল সংখ্যক নারী এই নির্যাতনকে সাপোর্ট করছেন। কেউ লিখেছেন, “কম করেছেন।” কেউ লিখেছেন, “এটাই হওয়া উচিত ছিল।” কেউ লিখেছেন, “হিরোইন।”

আপনি থমকে যান।

এটা কি সত্যিই ন্যায়বিচার? নাকি আমাদের সমাজ একটা এমন জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখানে সহিংসতাই একমাত্র বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে?

আফরোজা শেখ ইতি। বয়স সম্ভবত তিরিশের কোঠায়।  সে একজন বিবাহিত পুরুষের প্রেমে পড়ল। পুরুষটির প্রথম স্ত্রী আছে—এটা ইতি জানত। তারপরও সে বিয়ে করল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই শুরু হলো সমস্যা। ইতি প্রথম স্ত্রীকে মেনে নিতে পারছিল না। সে স্বামীকে চাপ দিতে লাগল—প্রথম স্ত্রীকে তালাক দাও। শুধু আমার সাথেই সংসার করো।

স্বামী রাজি হলেন না।

একজন মানুষ হিসেবে তার কষ্ট, ক্ষোভ-এর অনুভূতি নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সে কী করল?

সে প্রতিশোধ নিল। নৃশংস, অমানবিক প্রতিশোধ। স্বামীকে খুন করল।

এবং সোশ্যাল মিডিয়া তাকে সমর্থন জানাল।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন? কেন এত মানুষ এই সহিংসতাকে সেলিব্রেট করছে?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, “বাংলাদেশের সমাজ এখন একটা ট্রানজিশনাল ফেইজে আছে। প্যাট্রিআর্কি বা পুরুষতন্ত্র এখনো শক্তিশালী, কিন্তু নারীরাও আর চুপ করে নেই। তারা প্রতিবাদ করছে। কিন্তু সমস্যা হলো, আমাদের সমাজে প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে সহিংসতা।”

“আমাদের সমাজে ডিভোর্স বা বিবাহবিচ্ছেদ এখনো একটা স্টেগমা। একজন নারী যদি অসুখী বিয়ে থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাকে সামাজিকভাবে, আইনিভাবে, অর্থনৈতিকভাবে প্রচুর সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। ফলে অনেক নারী বিকল্প পথ খুঁজছেন। আর সেই বিকল্প পথ হলো—প্রতিশোধ।”

অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, “এটাকে বলা যায় ‘কাউন্টার ভায়োলেন্স’ বা পাল্টা সহিংসতা। যখন একজন মানুষ মনে করে তাকে অবিচার করা হয়েছে, এবং তার কাছে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো আইনি বা সামাজিক পথ নেই, তখন সে নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে।”

“সোশ্যাল মিডিয়ায় এই হাজার হাজার রিঅ্যাক্ট প্রমাণ করে, আমাদের সমাজের একটা বড় অংশ মনে করে—এটাই ন্যায়বিচার। তারা জাস্টিস সিস্টেমকে বিশ্বাস করে না। তারা বিশ্বাস করে পাল্টা সহিংসতাকে।”

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, “এটাকে বলা যায় ‘ডিসপ্লেসড এগ্রেশন’। একজন নারী যখন স্বামীর ওপর সরাসরি এগ্রেশন দেখাতে পারেন না, তখন সেই এগ্রেশন অন্য কোথাও ডিসপ্লেস হয়। অনেক সময় এই এগ্রেশন কাজের মেয়েদের ওপর, বাচ্চাদের ওপর, এমনকি নিজের ওপরও প্রয়োগ হয়।”

“আপনি যখন বাস্তবে সহিংসতার আকাঙ্ক্ষা লালন করেন, তখন আপনি নিজের ওপরও সহিংসতাকে আমন্ত্রণ জানান। এই নারীর মূল্যবোধ এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, তিনি একটা নৃশংস হত্যাকান্ড ছাড়া আর কোনো কিছুতে সমাধান খুঁজে পাননি।” অনেকেই এইটার বদলে সুইসাইড বা আত্মহত্যা করে। অর্থাৎ, সংকটের মুখে তাদের ভ্যালু ফর লাইফ বা জীবনের মূল্যবোধ শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

বিয়ের আগে বা সংসার শুরু করার আগে এতটুকু ভ্যালু গেইন করা জরুরি, যেন এইসব করে জীবনটা শেষ না করা লাগে। নিজের ইম্পালস বা আবেগের ওপর এতটুকু কন্ট্রোল না থাকলে, মানুষ পশুর চেয়ে খুব আলাদা কিছুই থাকে না।

এবার তাকানো যাক বিশ্বের অন্যান্য দেশের দিকে। তাঁরা এ বিষয়টা কিভাবে সামলায়।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো (নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক): এখানে ডিভোর্স রেট অনেক বেশি, কিন্তু সহিংসতার ঘটনা অনেক কম। কারণ, এখানে ডিভোর্সের জন্য কোনো স্টেগমা নেই। আইনি প্রক্রিয়া সহজ। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সেফ এক্সিট রুট আছে।

জাপান: এখানে একসময় ডিভোর্স রেট খুব কম ছিল। কিন্তু এখন ‘ডিভোর্স থেরাপি’ নামে একটা কনসেপ্ট চালু হয়েছে। দম্পতিরা থেরাপিস্টের কাছে যান, এবং যদি সংসার আর টেনে নেওয়া সম্ভব না হয়, তবে তারা সম্মিলিতভাবে বিবাহবিচ্ছেদ করেন। সহিংসতা নয়, সংলাপ।

ফ্রান্স: এখানে ‘পিএসিএস’ (পাক্ত সিভিল দ্য সোলিদারিতে) নামে এক ধরনের সিভিল পার্টনারশিপ আছে। এটা বিয়ের মতোই, কিন্তু এখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সহজ। ফলে মানুষ বিয়ে না করেও একসাথে থাকতে পারেন, এবং প্রয়োজনে সহজে আলাদা হতে পারেন।

আমেরিকা: এখানে কো-হ্যাবিটেশন বা বিয়ে না করে একসাথে থাকার ট্রেন্ড বাড়ছে। মানুষ বিয়ের মতো একটা লাইফটাইম কমিটমেন্টে যাওয়ার আগে অনেক সময় একসাথে থাকেন, এবং যদি দেখেন সম্পর্কটা কাজ করছে না, তবে সহজে আলাদা হয়ে যান।

বাংলাদেশে সমস্যাটা কোথায়?

“আমাদের সমস্যার জায়গাটা হলো—ম্যারেজ ইনস্টিটিউশনটা সবার জন্য হ্যাপি-ডিউরেবল-ওয়ার্কেবল না। অনেকেরই এইখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দরকার পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে পুরো ব্যাপারটার কোনো সেফ এক্সিট রুট নেই।”

“একটা আনহ্যাপি ম্যারেজ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এখানে প্রচুর রিস্ক। যৌতুকের মামলা, নারী নির্যাতনের মামলায় হয়রানি, সামাজিক ক্ষতি। ফলে অনেকে আটকে থাকেন। আর সেই আটকে থাকাটা একসময় বিস্ফোরিত হয় সহিংসতায়।”

আরেকটা বড় সমস্যা হলো—মোনোগ্যামি বা একবিবাহ জিনিসটা আর ফাংশনাল না এই হাইপার-কানেক্টিভিটির দুনিয়ায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, “মডার্নিটি পুরুষকে জোর করে মোনোগ্যামাস বানাতে চেয়েছে, পারেনি। ফলে, পুরুষ এখন হাইপারগ্যামাস হওয়া শুরু করেছে। আর এই বাস্তবতাকে আপনি যতই অস্বীকার করবেন, এটা ততই সামনে আসতে শুরু করবে।”

ফিরে আসি সেই ইতির কাছে, যিনি স্বামীকে হত্যা করেছিলেন।

তিনি এখন কোথায়? জেলে ।

সে কি এখন শান্তিতে আছে?

সম্ভবত না। কারণ আপনি যখন সহিংসতার পথ বেছে নেন, তখন সেই সহিংসতা আপনাকেও গ্রাস করে।

সোশ্যাল মিডিয়ার সেই হাজার হাজার রিঅ্যাক্ট—এগুলো কোনো বিজয়ের বার্তা নয়। এটা আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ দর্পণ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশ শিখেছে—সম্পর্ক ভাঙতে পারে, কিন্তু সেটা সহিংসতা দিয়ে নয়। সেটা সংলাপ দিয়ে, আইন দিয়ে, সমাজের সমর্থন দিয়ে।

কিন্তু আমরা? আমরা এখনো সেই পথে যাইনি। আমরা এখনো বিশ্বাস করি—প্রতিশোধই একমাত্র বিচার।

ইতির গল্প আমাদের শেখায় একটা করুণ সত্য—যে সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সেফ এক্সিট রুট নেই, সেই সমাজে সহিংসতাই একমাত্র ভাষা হয়ে ওঠে।

আর সেই সহিংসতাকে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় হাজার হাজার মানুষ ‘লাভ’ রিয়্যাক্ট দিয়ে উদযাপন করে, তখন বুঝতে হবে—আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।

খুব দূরে।

আর সেই দূরত্বটা কমাতে হলে প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে—সহিংসতা কখনোই বিচার হতে পারে না।

কখনোই না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *