প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে মানবপাচারের কৌশল। একসময় সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে মানুষ পাচারই ছিল অপরাধচক্রের প্রধান পদ্ধতি। এখন সেই চক্রগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভুয়া অনলাইন নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল যোগাযোগের মাধ্যমে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মানুষকে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। পরে তাদের অনেককে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে জোরপূর্বক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার ও আন্তর্জাতিক স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ‘বিশ্ব মানবপাচার বিরোধী দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এবারের সংলাপের প্রতিপাদ্য ছিল— “ট্রাপড বিহাইন্ড দ্য স্ক্যাম : এন্ডিং হিউম্যান ট্রাফিকিং ফর ফোর্সড ক্রিমিনালিটি”।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানবপাচার এখন আর শুধু প্রচলিত অপরাধ নয়; এটি প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কভিত্তিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা অনলাইনে আকর্ষণীয় চাকরির বিজ্ঞাপন ও উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে বিশেষ করে তরুণ ও চাকরিপ্রার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। বিদেশে নেওয়ার পর অনেককে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে ভয়ভীতি, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই নতুন ধরনের হুমকি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত, বেসরকারি সংস্থা এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান (প্রতিরোধ ও দমন) আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতিসংঘের ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম কনভেনশন (ইউএনটিওসি) ও সংশ্লিষ্ট প্রটোকলের আলোকে তৈরি এই আইনে অনলাইন স্ক্যাম, প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতারণা এবং মানুষকে জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করার মতো নতুন ধরনের অপরাধকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ‘মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭’ যুগোপযোগী করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে প্রতিরোধ, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, বিচার এবং অংশীদারিত্ব—এই চারটি মূল ভিত্তিকে সামনে রেখে ‘জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২৬–২০৩০)’ চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
ভুক্তভোগীদের সহায়তার বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক ও আইনগত দায়িত্ব। এ জন্য ‘ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (এনআরএম)’ আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে, যাতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন সুবিধা পান।
তিনি জানান, মানবপাচার-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং মামলা পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্মও তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি নিরাপদ অভিবাসন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এবং ভুয়া নিয়োগ চক্র সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করতে গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংলাপে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব মো. লিয়াকত আলী মোল্লা, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির, ইউরোপীয় ইউনিয়নের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাইবা জারিনা এবং আইওএম বাংলাদেশের চিফ অব মিশন ড. লরা টম বোন্ডেসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনের পর অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় প্রযুক্তিনির্ভর মানবপাচার, প্রতারণামূলক নিয়োগ এবং অনলাইন শোষণের বর্তমান চিত্র তুলে ধরা হয়। আলোচনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং কম্বোডিয়ার একটি অনলাইন স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার হওয়া এক ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) এবং জাতিসংঘের অভিবাসন নেটওয়ার্কের কাউন্টার ট্রাফিকিং টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ যৌথভাবে এ জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে। এতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, কূটনৈতিক মিশন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।