ভেনিসে ইতিহাস গড়ল ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য ২০২৬ সালের ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক এক অধ্যায়। প্রথমবারের মতো দেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ জায়গা করে নিয়েছে উৎসবের অফিসিয়াল অরিজন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে।

ভেনিসের ৮৩তম আসরে নির্বাচিত হওয়ার পর এবার সিনেমাটি পেয়েছে আরও একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের দেয়া সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি হিসেবে প্রেমিও বিসাতো দোরো জিতেছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ এর পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন ।

তবে এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রেমিও বিসাতো দোরো ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল পুরস্কার নয় এটি স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের দেওয়া একটি আলাদা স্বীকৃতি। ফলে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস উৎসবের মূল প্রতিযোগিতার কোনো পুরস্কার জিতেছে—এমন দাবি সঠিক হবে না।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিসের অরিজন্তি কম্পিটিশন বিভাগে নির্বাচিত বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। বিভাগটি নতুন চলচ্চিত্রভাষা, সমকালীন প্রবণতা ও নির্মাণের উদ্ভাবনী পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেয়। ২০২৬ সালে এই বিভাগে ১৯টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচিত হয়।

সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ৮৮ মিনিট। এর ভাষা বাংলা ও ইংরেজি। প্রযোজনায় রয়েছে বাংলাদেশ, ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে ও জার্মানির প্রতিষ্ঠান। ভেনিসের অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী সিনেমাটির প্রযোজকদের মধ্যে রয়েছেন ফ্রাঁসোয়া দার্তেমার, পেদ্রো বোরগেস, রুবাইয়াত হোসেন, আদনান ইমতিয়াজ আহমেদ, ইনগ্রিড লিল হটগুন ও আনা কাটশকো।

সিনেমাটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয় ৬ সেপ্টেম্বর ভেনিসের সালা দারসেনা-য়।

‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর গল্প সমকালীন ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী বিউটি পার্লারকে ঘিরে। কেন্দ্রীয় চরিত্র জাইনিন বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সৌন্দর্যচর্চা, পারিবারিক প্রত্যাশা ও সামাজিক রীতির মধ্যে দিয়ে এগোতে থাকে তার প্রস্তুতি।

কিন্তু একপর্যায়ে তার শরীর অস্বাভাবিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। ঘরোয়া চিকিৎসা, সামাজিক চাপ এবং অস্বস্তিকর নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বিয়ের প্রস্তুতি পরিণত হয় শারীরিক ও মানসিক সংগ্রামে।

সিনেমাটিতে নারীর শরীর, সৌন্দর্যের সামাজিক মানদণ্ড, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং নারীর ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে ভিন্নধারার চলচ্চিত্রভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

গল্পটির সূত্র রুবাইয়াতের শৈশবের একটি স্মৃতি। ঢাকার মেফেয়ার বিউটি পার্লারে ছোটবেলায় শোনা একটি শহুরে কিংবদন্তি দীর্ঘদিন ধরে তার মনে ছিল। প্রায় দুই দশক ধরে সেই গল্পের সঙ্গে কাজ করতে করতে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের রূপ নেয়।

পরিচালকের ভাষ্যে, ২০০৬ সালে গল্পটির যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে। পরে বারবার লেখা ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে এটি তার নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

সিনেমাটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনিন চৌধুরী করিম। গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামাল, আজমেরী হক বাধন, দামের খান, সাবেরী আলম, শতাব্দী ওয়াদুদ ও মোহাম্মদ বারী।

চিত্রগ্রহণ করেছেন পর্তুগিজ সিনেমাটোগ্রাফার লিওনর টেলেস। সম্পাদনা করেছেন রাফায়েল মার্টিন-হোলগার। সংগীত পরিচালনা করেছেন ব্রিটিশ কম্পোজার জিম উইলিয়ামস।

সিনেমাটি ইতালির ফোন্দাৎসিওনে প্রাদা ফিল্ম ফান্ড-এর ২০২৫ সালের নির্বাচিত প্রকল্পগুলোর একটি।

ভেনিসের পর ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ যাচ্ছে কানাডায়। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটির উত্তর আমেরিকান প্রিমিয়ারের সূচি রয়েছে ১৬ই সেপ্টেম্বর। উৎসবের সূচিতে ১৭ই সেপ্টেম্বরও সিনেমাটির প্রদর্শনী রয়েছে।

এরপর সিনেমাটির আন্তর্জাতিক উৎসবযাত্রা আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা রয়েছে।

একই সময়ে ভেনিসে আরেকটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ নির্মাতা রাকায়েত রাব্বি। তার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য সুইটনেস অব এয়ার—হাওয়াই মিঠাই’-এর জন্য তিনি  সন অফ এ পিচ এওয়ার্ড ২০২৬ -এ বেস্ট ডিরেক্টর পুরস্কার পেয়েছেন।

যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত সিনেমাটিতে একটি শিশুর মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। গল্পে একটি শিশু গুলির খোসার বিনিময়ে তুলার মিছরি সংগ্রহ করে। পুরস্কারটি ঘোষণা করা হয় ১০ই সেপ্টেম্বর ভেনিসের হোটেল এক্সেলসিওর-এর ক্যাম্পারি লাউঞ্জ-এ।

সন অফ এ পিচ এওয়ার্ডও ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মূল পুরস্কার নয়। এটি সেভ দ্য কাট আয়োজিত একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা। ২০২৬ সালের আয়োজনটি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সমান্তরালে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

একই সময়ে ভেনিসে বাংলাদেশের দুই নির্মাতার এই স্বীকৃতি দেশের স্বাধীন চলচ্চিত্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একদিকে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে ভেনিসের অফিসিয়াল অরিজন্তি বিভাগে জায়গা করে ইতিহাস তৈরি করেছে। অন্যদিকে স্বাধীন চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রেমিও বিসাতো দোরো-তে রুবাইয়াত হোসেন পেয়েছেন সেরা পরিচালকের স্বীকৃতি।

অন্যদিকে রাকায়েত রাব্বির বেস্ট ডিরেক্টর পুরস্কার এসেছে ভেনিস উৎসবের সমান্তরালে আয়োজিত সন অফ এ পিচ এওয়ার্ড থেকে।

ভেনিস উৎসবের মূল পুরস্কার না হলেও ২০২৬ সালে ভেনিসে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উপস্থিতি কেবল অংশগ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুটি পৃথক আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশি নির্মাতারা পেয়েছেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের আন্তর্জাতিক যাত্রায় এ ঘটনাকে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *