একসময় চারটি দেশের অর্থনৈতিক ধারণা ছিল ব্রিকস। দুই দশকের কিছু বেশি সময়ে সেটি পরিণত হয়েছে ১১ দেশের প্রভাবশালী জোটে। এখন বিশ্বের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ এই জোটের সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও তাদের সম্মিলিত অংশ প্রায় এক-চতুর্থাংশ।
শনিবার (১২ই সেপ্টেম্বর) নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, সামুদ্রিক বাণিজ্যে ঝুঁকি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
তবে ব্রিকসের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বাইরের সংকট নয়। প্রশ্ন উঠেছে জোটের ভেতরের ঐক্য নিয়ে। সম্প্রসারণের ফলে ব্রিকসের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে সদস্যদের স্বার্থের সংঘাতও।
ব্রিকসের গল্প শুরু হয়েছিল রাজনীতির টেবিলে নয়, একটি অর্থনৈতিক গবেষণাপত্রে। ২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল ‘ব্রিক’ শব্দটি ব্যবহার করেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে তৈরি হয় এই সংক্ষিপ্ত নাম। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর সম্ভাবনা তুলে ধরা।
২০০৯ সালে চার দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে একসঙ্গে আসে। ২০১১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে ব্রিক হয়ে যায় ব্রিকস।
এরপর জোটের বিস্তার আরও দ্রুত হয়েছে। ২০২৪ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যোগ দেয়। ২০২৫ সালে পূর্ণ সদস্য হয় ইন্দোনেশিয়া। সৌদি আরবকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও দেশটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সদস্যপদ গ্রহণ করেনি।
এই সম্প্রসারণে ব্রিকসের ভৌগোলিক পরিসর অনেক বেড়েছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো এখন একই প্ল্যাটফর্মে।
ব্রিকসের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক রয়েছে। রাশিয়া ও চীন জোটটিকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য তৈরির একটি হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চায়। অন্যদিকে ভারত ও ব্রাজিল তুলনামূলকভাবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এই পার্থক্যই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এবং দুর্বলতা।
জোটের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি হলো নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক সদস্য ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। এখন পর্যন্ত ব্যাংকটির অনুমোদিত প্রকল্পের মূল্য প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার।
ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতেও ব্রিকস কাজ করছে। নিজস্ব আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সদস্য দেশগুলোর স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ তার অংশ। তবে এখন পর্যন্ত একটি অভিন্ন ব্রিকস মুদ্রা তৈরির কোনো বাস্তব সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং এ নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে বাস্তব অর্থনৈতিক সহযোগিতাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
১১ সদস্যের ব্রিকস এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। কিন্তু সেই বৈচিত্র্য ঐকমত্যের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
মে মাসে নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে সদস্যদের মতপার্থক্য ছিল এর প্রধান কারণ। ভারত শেষ পর্যন্ত চেয়ার হিসেবে একটি বিবৃতি দেয়। সেখানে সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যের কথা উল্লেখ করা হয়।
ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষা ব্যবহার করা হোক। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলার বিষয়টিও বিবৃতিতে গুরুত্ব দিতে চেয়েছিল। দুই অবস্থানের মধ্যে সমঝোতা হয়নি। এ ঘটনা দেখিয়ে দেয়, একই জোটে থাকা মানেই একই ভূরাজনৈতিক অবস্থান নয়।
এবারের সম্মেলনের শুরুতেই অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, ব্রিকস নেতারা একটি যৌথ ঘোষণায় একমত হয়েছেন। এতে কোনো দেশের নাম না নিয়ে একতরফা যুদ্ধের নিন্দা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এতে সম্মতি দিয়েছে।
এর ফলে মে মাসের ব্যর্থতার পর ভারতের জন্য একটি কূটনৈতিক সাফল্য তৈরি হয়েছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্সের বৈঠকও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে এটি ছিল উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ। অর্থাৎ দিল্লি সম্মেলন শুধু ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে না। জোটের ভেতরের বিরোধ সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও পরীক্ষা করছে।
ব্রিকসের সম্প্রসারণ ওয়াশিংটনের নজর এড়ায়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসের সম্ভাব্য নতুন মুদ্রা বা ডলারের বিকল্প তৈরির উদ্যোগের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর প্রশাসনের নীতিও জোটটির ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
তবে ব্রিকসের ভেতরেও এ বিষয়ে পুরোপুরি অভিন্ন অবস্থান নেই। সদস্য দেশগুলোর অনেকেই ডলারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চায়। কিন্তু একটি অভিন্ন মুদ্রা চালুর মতো বড় পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সমন্বয় এখনো তৈরি হয়নি। তাই ব্রিকসের বাস্তব অগ্রগতি আপাতত স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট এবং উন্নয়ন অর্থায়নের মতো ক্ষেত্রে বেশি দেখা যাচ্ছে।
এবারের সম্মেলনে ভারতের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে নয়াদিল্লি রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ব্রিকসের ভেতরে ভারতকে একই সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী এবং নিজের জাতীয় স্বার্থের রক্ষক হিসেবে কাজ করতে হচ্ছে।
চীনের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বৈঠক করেছেন। দুই দেশ বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সীমান্ত উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছে।
এটি ব্রিকসের ভেতরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। জোটটি শুধু পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বিভক্ত নয়। সদস্যদের নিজেদের মধ্যেও বড় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
দুই দশকে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এর বিস্তার। একটি অর্থনৈতিক শব্দ থেকে এটি এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিচিত শক্তি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
কিন্তু বড় হওয়া আর শক্তিশালী হওয়া এক বিষয় নয়। সদস্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিকসের ভেতরে অর্থনৈতিক স্বার্থের পার্থক্যও বাড়ছে। চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সদস্যদের মধ্যে সংঘাত রয়েছে। রাশিয়া পশ্চিমের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত। ভারত ও ব্রাজিল আবার জোটটিকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে আগ্রহী নয়।
এই বাস্তবতায় ব্রিকসের সামনে মূল প্রশ্ন হলো—এটি কি একটি সমন্বিত রাজনৈতিক জোট হবে, নাকি ভিন্ন স্বার্থের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে?
নয়াদিল্লির সম্মেলন সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেবে না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট। ব্রিকস যত বড় হচ্ছে, তাকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তত কঠিন হচ্ছে।
আর এই দ্বৈত বাস্তবতাই ব্রিকসের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—বিশ্বমঞ্চে প্রভাব বাড়ানো, কিন্তু নিজের ভেতরের বৈপরীত্য সামলে রাখা।