যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক এক মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। ইরান সম্পর্কে তাঁর দুটি বক্তব্য বিশেষভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে। তিনি দাবি করেন, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ‘শুধু ধর্মতত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত’ এবং ‘ইরানের সঙ্গে আজ পর্যন্ত কেউ সফল কোনো চুক্তি করতে পারেনি’।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিকদের একটি অংশ বলছেন, এই দুই দাবিই বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের মতে, ইরানের পররাষ্ট্রনীতি ধর্মীয় আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হলেও দেশটির নিরাপত্তা, অর্থনীতি, আঞ্চলিক প্রভাব এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সমালোচকদের আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির নাম। দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী আরাকচি ২০১৫ সালের যৌথ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) বা ইরান পারমাণবিক চুক্তির অন্যতম প্রধান আলোচক ছিলেন। ওই চুক্তি ইরান, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য এবং জার্মানির মধ্যে সম্পাদিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) চুক্তি বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ ও যাচাই করেছিল। বহু আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের মতে, চুক্তিটি কার্যকর ছিল এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারি নিশ্চিত করেছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকেই চুক্তিটি কার্যত সংকটে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে কখনো সফল কোনো চুক্তি হয়নি—এমন দাবি ঐতিহাসিক তথ্যের সঙ্গে মেলে না। জেসিপিওএ তার অন্যতম উদাহরণ।
মার্কো রুবিওকে ঘিরে সমালোচনার আরেকটি কারণ তাঁর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক অবস্থান। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি প্রায়ই জটিল ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ব্যাখ্যা করেন। ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো, বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র এবং দীর্ঘ আলোচনার ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর পর্যাপ্ত বোঝাপড়া রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
তবে রুবিওর সমর্থকরা ভিন্ন মত পোষণ করেন। তাঁদের মতে, ইরানের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগের কারণে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যৌক্তিক। তারা মনে করেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ববর্তী চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, বর্তমান বিতর্কটি শুধু একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যকে ঘিরে নয়। এটি বৃহত্তরভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কূটনৈতিক সাফল্যের জন্য প্রতিপক্ষের অবস্থান, ইতিহাস এবং কৌশলগত স্বার্থ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অপরিহার্য। ভুল তথ্য বা অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক বক্তব্য কখনো কখনো আলোচনার পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এই বিতর্ক আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে কূটনৈতিক ভাষা ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।