১৯৮২ বিশ্বকাপ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেয় আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া। নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই জয়ের উল্লাসে মেতে ওঠা দলটি কয়েক দিনের মধ্যেই শিকার হয়েছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম ন্যাক্কারজনক ঘটনার। সেই ঘটনার পর শুধু আলজেরিয়ার জন্যই নয়, সমব্যথী হয়েছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব। এমনকি পরবর্তীতে বিশ্বকাপের নিয়মেও আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
আজকের গল্প সেই ঘটনারই।
নবাগত আলজেরিয়ার প্রথম ম্যাচ ছিল তৎকালীন ফুটবল পরাশক্তি পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে। সেই বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচেই চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বেলজিয়াম চমক দেখালেও, আলজেরিয়া যে একই ধরনের চমক উপহার দেবে—এমনটা বিশ্বাস করার মতো মানুষ খুব কমই ছিল।
কিন্তু পুরো বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েই সেটি করে দেখায় ‘আফ্রিকান ফক্স’রা।
পশ্চিম জার্মানি সেবার বিশ্বকাপে এসেছিল দুর্দান্ত ফর্ম নিয়ে। নিজেদের জয়ের ব্যাপারে তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে ম্যাচের আগে আলোচনার মূল বিষয় ছিল—জার্মানি কত গোল করবে। এমনকি সংবাদ সম্মেলনে আলজেরিয়াকে তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করেছিলেন জার্মান খেলোয়াড়রা।
তারা বলেছিলেন, সপ্তম গোলটি নিজেদের কুকুরকে এবং অষ্টম গোলটি স্ত্রী ও বান্ধবীদের উৎসর্গ করবেন। কোচ জুপ ডারওয়াল তো ঘোষণা দিয়েছিলেন, এই ম্যাচে হেরে গেলে মিউনিখে ফেরার ট্রেন থেকেই তিনি নদীতে ঝাঁপ দেবেন।
জার্মানরা আলজেরিয়াকে কার্যত হিসাবের মধ্যেই ধরেনি। আর সেটিই শেষ পর্যন্ত আলজেরিয়ার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে। প্রতিপক্ষকে নিয়ে তেমন কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই মাঠে নেমেছিলেন ডারওয়ালের শিষ্যরা।
পরে ডারওয়াল স্বীকারও করেছিলেন, আলজেরিয়ার খেলার একটি ভিডিও তার কাছে ছিল। কিন্তু তিনি খেলোয়াড়দের সেটি দেখতে বলেননি। কারণ তার ধারণা ছিল, ভিডিওটি দেখলে পশ্চিম জার্মানির খেলোয়াড়রা হেসে গড়াগড়ি খাবেন।
কিন্তু জার্মানরা জানত না, নাইজেরিয়াকে হারিয়েই বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করেছিল আলজেরিয়া। বিশ্বকাপের আগে প্রীতি ম্যাচে তারা হারিয়েছিল আয়ারল্যান্ড, রিয়াল মাদ্রিদ ও বেনফিকার মতো দলকেও। ভিডিওটি দেখলে জার্মানরা হয়তো আরও জানতে পারত, গতি ও পায়ের দক্ষতার পাশাপাশি মাঠে প্রতিটি আলজেরিয়ান খেলোয়াড়ের তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।
ম্যাচের দিন কৌশলগত দিক থেকেও এগিয়ে ছিল আলজেরিয়া। গোলমুখে পল ব্রাইটনারকে প্রায় একাই নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিলেন ফুলব্যাক শাউই মারজিকান। দ্বিতীয়ার্ধে যোগ্যতর দল হিসেবেই ৫৪ মিনিটে এগিয়ে যায় আলজেরিয়া। রাবাহ মাজদারের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে লিড নেয় তারা।
তবে জার্মানরা দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায়। ৬৭ মিনিটে দলকে সমতায় ফেরান কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে। কিন্তু সেই গোলের পর সেন্টার থেকে খেলা শুরুর মাত্র নয়টি পাসের মধ্যেই আবার গোল করে বসে আলজেরিয়া। জার্মানদের হতভম্ব করে দেওয়া সেই গোলটি করেন লাখদার বেলৌমি। পরে তিনি এটিকেই নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন।
অন্যদিকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হওয়া মারজিকানের পারফরম্যান্সে ম্যাচের ধারাভাষ্যকার হিউ জোনস এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তাকে এই বিশ্বকাপের সেরা আবিষ্কার বলে মন্তব্য করেছিলেন।
৮৮ মিনিটে নিজেও গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন এই ডিফেন্ডার। নিজেদের ডি-বক্স থেকে বল নিয়ে একাই পৌঁছে গিয়েছিলেন পশ্চিম জার্মানির ডি-বক্সে। গোলরক্ষক হ্যারাল্ড শুমাখার দুর্দান্তভাবে বলটি ঠেকিয়ে না দিলে সেটি টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা গোল হয়ে যেতে পারত।
ম্যাচ শেষে দুই দলের আবহ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আলজেরিয়ানরা ছিল উচ্ছ্বসিত, আর জার্মান শিবিরে নেমে এসেছিল হতাশা। বেলৌমি পরে বলেছিলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই জার্মান দল ও দেশকে সম্মান দেখিয়েছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয় হলো, আমরা তাদের আমাদের সম্মান করতে বাধ্য করেছি।’
তবে আলজেরিয়ার এই জয়োৎসব বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পরের ম্যাচেই অস্ট্রিয়ার কাছে ২-০ গোলে হেরে যায় তারা। এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয় বড় মঞ্চে খেলোয়াড়দের অভিজ্ঞতার অভাব। জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর তাদের আরও সংযত থাকা প্রয়োজন ছিল। সেই ঘাটতির প্রভাব পড়ে দ্বিতীয় ম্যাচে।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়া কোনোভাবেই হালকাভাবে নেয়নি আলজেরিয়াকে। অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ স্মিড আফ্রিকান নেশনস কাপ থেকেই আলজেরিয়ার খেলার ধরন অনুসরণ করে আসছিলেন। ফলে তার শিষ্যরা ম্যাচটি জিতে নেয় তুলনামূলক সহজেই।
তবে সেই হারের ধাক্কা কাটিয়ে পরের ম্যাচে ট্র্যাকে ফিরে আলজেরিয়া। চিলিকে ৩-২ গোলে হারিয়ে আবারও সম্ভাবনা জাগিয়ে তোলে তারা। কিন্তু এই ম্যাচেও অনভিজ্ঞতার মূল্য দিতে হয়।
একসময় ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল আলজেরিয়া। চাইলে তারা গোল ব্যবধান অক্ষুণ্ন রেখে রক্ষণাত্মক কৌশল নিতে পারত। কিন্তু নিজেদের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে গিয়ে তারা একের পর এক আক্রমণ চালায়। ফলস্বরূপ উল্টো আরও দুটি গোল হজম করতে হয়।
তবু এই জয়ের ফলে সুবিধাজনক অবস্থানে চলে যায় আলজেরিয়া। শুধুমাত্র গ্রুপের শেষ ম্যাচের একটি নির্দিষ্ট ফলাফলই তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার পথে বাধা হতে পারত—অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পশ্চিম জার্মানির ১-০ গোলের জয়।
সে ক্ষেত্রে তিন দলেরই পয়েন্ট হতো সমান, কিন্তু গোল ব্যবধানে বাদ পড়ে যেত আলজেরিয়া। ১-০ ছাড়া অন্য যেকোনো ফলাফলই আলজেরিয়াকে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে দ্বিতীয় রাউন্ডে তুলে দিত।
ম্যাচের দিন মাত্র ১০ মিনিটেই হর্স্ট রুবেশ পশ্চিম জার্মানিকে এগিয়ে দেন। তারপর?
তারপর আর কিছুই হয়নি।
এই স্কোর দুই দলের জন্যই সুবিধাজনক ছিল। ফলে বাকি প্রায় ৮০ মিনিট মাঠে চলেছে নামমাত্র ফুটবল। গোলের জন্য কার্যত কোনো প্রচেষ্টাই দেখা যায়নি। দুই দল যেন পুরো বিশ্বের সামনে এক প্রকার সমঝোতার খেলায় মেতে উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ শেষ হয় ১-০ গোলে।
আর সেই সঙ্গে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় আলজেরিয়ার স্বপ্ন।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই গিজোনের মাঠের বাইরে শুরু হয় আলজেরিয়ান সমর্থকদের প্রতিবাদ। স্থানীয় স্প্যানিশ সমর্থকেরাও তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। সংবাদমাধ্যমগুলোও ব্যাপকভাবে এই ঘটনাকে ষড়যন্ত্রমূলক ম্যাচ হিসেবে তুলে ধরে।
তবে অস্ট্রিয়া ও পশ্চিম জার্মানির কোনো খেলোয়াড়ই সংবাদ সম্মেলনে কথা বলতে চাননি। উল্টো অস্ট্রিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বিতর্কিত মন্তব্য করে বসেন। তিনি বলেন, ‘পুরো ম্যাচটি ছিল একটি কৌশলগত লড়াই। এখানে যদি ১০ হাজার মরুভূমিবাসী এসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ খুঁজে, তাহলে বলতে হবে তারা কেউই শিক্ষিত নয়।’
অন্যদিকে আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা ছিলেন শান্ত। মারজিকান বলেছিলেন, ‘আমরা মাথা উঁচু করেই বিদায় নিচ্ছি। কিন্তু তারা দ্বিতীয় রাউন্ডে যাচ্ছে মাথা নিচু করে।’
অনেক বিতর্ক ও সমালোচনার পরও ফিফা শেষ পর্যন্ত কোনো দলকে শাস্তি দেয়নি। কারণ, তাদের হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না।
তবে সেই ম্যাচের পর বিশ্বকাপের নিয়মে আসে বড় পরিবর্তন। ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর থেকে গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডের দুটি ম্যাচ একই সময়ে শুরু করার নিয়ম চালু করা হয়, যাতে কোনো দল অন্য ম্যাচের ফল জেনে সুবিধা নিতে না পারে।
এ কারণেই বেলৌমি পরে বলেছিলেন, ‘এটি শুধু একটি জয় নয়, এর চেয়েও বড় কিছু। এটি প্রমাণ করে যে আলজেরিয়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পেরেছে।’
আলজেরিয়ার খেলোয়াড়রা হয়তো শান্ত ছিলেন। কিন্তু সেদিন লাখো আলজেরিয়ানের সঙ্গে কেঁদেছিল পুরো ফুটবল বিশ্ব।
অবশ্য, অস্ট্রিয়ান ও পশ্চিম জার্মান সমর্থকেরা ছাড়া।