৪০ বছর বয়সে বিশ্বকাপ অভিষেক, স্পেনকে থামিয়ে ইতিহাসের নায়ক ভাজিনহা

শৈশবে বাবার একটি স্বপ্ন ছিল। ব্রাজিল ফুটবলের ভক্ত বাবা চেয়েছিলেন, ছেলে একদিন ফুটবলের জগতে পরিচিত হবে। সেই ভালোবাসা থেকেই ছেলের নাম রাখেন ব্রাজিলের সাবেক তারকা জসিমারের নামে। ১৯৮৬ সালে জন্ম নেওয়া জোসিমার দিয়াস, যিনি ফুটবল বিশ্বে পরিচিত ভাজিনহা নামে, বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন প্রায় চার দশক পরে।

আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে। জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখের কাছাকাছি। ফুটবলের বড় ঐতিহ্য না থাকা এই দেশ থেকেই উঠে এসেছেন ভাজিনহা। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলের প্রতি ছিল তার গভীর ভালোবাসা। কিন্তু কেপ ভার্দেতে পেশাদার ফুটবলে টিকে থাকা সহজ ছিল না।  এক সময় জীবনের বাস্তবতায় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য ব্যাংকের চাকরিতেও যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ফুটবল থেকে দূরে থাকতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে আবার ফিরে আসেন মাঠে। শুরু হয় নতুন লড়াই।

ফুটবলের জন্য ভাজিনহা ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশে। খেলেছেন পর্তুগালের ক্লাবে। এছাড়া সাইপ্রাস ও স্লোভাকিয়ার ফুটবল লিগেও খেলেছেন। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২৫ বছর বয়সে তার পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয়। জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক হয় ২০১২ সালে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ভাজিনহার জীবনে নিয়ে আসে সবচেয়ে বড় সুযোগ। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে আসে কেপ ভার্দে। কিন্তু প্রথম ম্যাচেই সামনে ছিল শক্তিশালী স্পেন। ইউরোপের অন্যতম সেরা দল, বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট।

অনেকের ধারণা ছিল, অভিজ্ঞতা ও শক্তির পার্থক্যে স্পেন সহজেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু মাঠে গল্প লিখলেন ৪০ বছর বয়সী এক গোলরক্ষক।

স্পেনের আক্রমণ সামলাতে ভাজিনহা হয়ে উঠলেন অদম্য দেয়াল। একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি করেন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ। স্পেনের তারকা ফুটবলারদের মধ্যে লামিন ইয়ামাল, পেদ্রি ও মিকেল ওয়ারিজাবালের মতো খেলোয়াড়দের সামনে তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী।

৯০ মিনিট শেষে স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল ০-০। কেপ ভার্দে শুধু স্পেনকে রুখেই দেয়নি, নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচেই অর্জন করে ঐতিহাসিক একটি পয়েন্ট। আর সেই ইতিহাসের মূল নায়ক হন ভাজিনহা। ম্যাচসেরার পুরস্কারও ওঠে তার হাতে।

ম্যাচ শেষে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভাজিনহা। চোখের জলে স্মরণ করেন তার পরিবারকে। বিশেষ করে সেই মানুষদের, যারা তাকে বড় করেছেন এবং এই মুহূর্ত দেখার জন্য পাশে থাকতে পারেননি।

ভাজিনহার গল্প শুধু একজন গোলরক্ষকের গল্প নয়। এটি অপেক্ষা, সংগ্রাম আর বিশ্বাসের গল্প। ৪০ বছর বয়সেও যে স্বপ্নের দরজা খুলতে পারে, বিশ্বকাপ আবারও সেটাই প্রমাণ করল।

ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ভাজিনহা দেখিয়ে দিলেন—স্বপ্নের কোনো বয়স নেই। কখনো কখনো সবচেয়ে বড় মুহূর্ত আসতে সময় লাগে, কিন্তু এলে তা ইতিহাস হয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *