ভালো কাজের আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়ে অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন মাদক মামলায়। বিশেষ করে কাতারে কাজের সন্ধানে থাকা কিছু প্রবাসী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া কথিত চাকরি, ডেলিভারি কাজ বা পরিচিতজনের দেওয়া পার্সেলের কারণে ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়ছেন।
কাতারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসা কয়েকটি ঘটনার বর্ণনায় দেখা যায়, অনেকেই দাবি করেছেন—তারা জানতেন না যে তাদের বহন করা প্যাকেট, কাগজ বা পার্সেলের ভেতরে মাদক ছিল। কিন্তু আইনের দৃষ্টিতে কারও কাছে থাকা বা বহন করা অবৈধ বস্তু সম্পর্কে অজ্ঞতা অনেক সময় তাদের রক্ষা করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছেন অনেকে।
কিশোরগঞ্জের আরমান মিয়া (ছদ্মনাম) তিন বছর আগে কাতারে যান। নির্দিষ্ট কাজ না পাওয়ায় বিভিন্ন জায়গায় কাজ খুঁজছিলেন। একসময় ফেসবুকে ডেলিভারি ও সাপ্লাইয়ের কাজের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন।
তাকে একটি পার্সেল নির্দিষ্ট স্থান থেকে সংগ্রহ করে অন্য জায়গায় পৌঁছে দিতে বলা হয়। মোবাইলে পার্সেলের ছবি ও লোকেশন পাঠানো হয়। সরল বিশ্বাসে নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে পার্সেল তুলতে গেলে কাতারের সিআইডি তাকে আটক করে।
তদন্তে তার মোবাইল ফোনে ওই ডেলিভারির তথ্য পাওয়া যায়। পরে জানা যায়, পার্সেলের ভেতরে ছিল মাদক। আদালতে তিনি দাবি করেন, তিনি কিছু জানতেন না এবং শুধু কাজের উদ্দেশ্যেই পার্সেল নিতে গিয়েছিলেন। তবে অভিযোগ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত প্রমাণ করতে না পারায় তিনি দীর্ঘ কারাদণ্ড পান।
প্রবাসীদের মধ্যে এমন আরও ঘটনার কথা জানা যায়, যেখানে ডেলিভারি কাজ, পরিচিত ব্যক্তির অনুরোধ বা অজ্ঞতার কারণে অনেকে মাদক মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।
অলি মিয়া (ছদ্মনাম) কাতারে যাচ্ছিলেন উন্নত জীবনের আশায়। বিমানবন্দরে পরিচিত এক ব্যক্তি তাকে একটি প্যাকেট দিয়ে বলেন, কাতারে তার ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে।
অলি মিয়া প্যাকেটটি না খুলেই সঙ্গে নিয়ে যান। কাতারে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে লাগেজ তল্লাশির সময় ওই প্যাকেট থেকে মাদক পাওয়া যায়।
তিনি পুলিশকে জানান, প্যাকেটটি তার নিজের নয়। তিনি শুধু পৌঁছে দিতে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু আইনগত প্রক্রিয়ায় তিনি মাদক বহনের দায়ে অভিযুক্ত হন। আদালত তাকে কারাদণ্ড দেন। দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাকে।
ফরহাদ হোসেন (ছদ্মনাম) ২০২৪ সালে কাতারে যান। তার রুমমেট দেশে যাওয়ার সময় কিছু সাদা কাগজ তার কাছে রেখে যান এবং পরে কোথাও পৌঁছে দিতে বলেন।
ফরহাদ কাগজগুলো সাধারণ কাগজ মনে করে রেখে দেন। পরে সিআইডি তার কক্ষে অভিযান চালিয়ে ওই কাগজসহ তাকে আটক করে। তদন্তে জানা যায়, ওই কাগজের সঙ্গে মাদক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি মাদক মামলায় সাজা ভোগ করছেন।
খোরশেদ আলম (ছদ্মনাম) ছয় বছর ধরে কাতারে ছিলেন। কাজের সংকটে তিনি ফেসবুকে সাপ্তাহিক বেতনের ভিত্তিতে ডেলিভারি কাজের প্রস্তাব পান।
কোম্পানির পরিচয় বা ঠিকানা যাচাই না করেই তিনি কাজটি করতে যান। নির্ধারিত স্থান থেকে পার্সেল সংগ্রহের সময় তাকে আটক করা হয়। পরে জানা যায়, পার্সেলের ভেতরে ছিল ‘শাবু’ বা আইস নামের মাদক।
যে নম্বর থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল, পরে সেটিও বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, অপরিচিত ব্যক্তি, অনলাইন বিজ্ঞাপন বা সহজ আয়ের প্রলোভনে কোনো ধরনের পার্সেল, প্যাকেট, খাম বা কাগজ বহন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরাপদ থাকতে প্রবাসীদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ:
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া সন্দেহজনক চাকরি বা ডেলিভারি কাজ যাচাই ছাড়া গ্রহণ না করা।
- অপরিচিত বা স্বল্প পরিচিত কারও দেওয়া ব্যাগ, প্যাকেট বা নথি বহন না করা।
- কোনো প্যাকেট বা পার্সেলের ভেতরে কী আছে নিশ্চিত না হয়ে তা নিজের কাছে রাখা বা পরিবহন না করা।
- অতিরিক্ত কমিশন বা সহজে বেশি টাকা আয়ের প্রস্তাব সম্পর্কে সতর্ক থাকা।
- আশপাশে সন্দেহজনক কোনো কার্যক্রম দেখলে কর্তৃপক্ষকে জানানো।
কাতারে মাদক সংক্রান্ত আইন কঠোর। তাই প্রবাসীদের নিজেদের নিরাপত্তা, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং বাংলাদেশি কমিউনিটির সুনাম রক্ষায় যেকোনো কাজ গ্রহণের আগে সতর্কভাবে যাচাই করা জরুরি।