মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষের চারপাশে চিত্রের বিস্ফোরণ ঘটছে, কিন্তু দেখার ক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। প্রতিদিন আমরা অসংখ্য ছবি, ভিডিও, বিজ্ঞাপন, রিল, পোস্ট ও দৃশ্যকল্পের মুখোমুখি হই; অথচ খুব কম ক্ষেত্রেই সেগুলোকে সত্যিকার অর্থে “দেখি”। দেখা এখন আর চিন্তা করার বিষয় নয়; বরং দ্রুত ভোগের বিষয়। অনুভূতি আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে না; তা অ্যালগরিদমনির্ভর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
বিপুল এই দৃশ্যের ভিড়ে মানুষ বাস্তবতাকে যতটা না উপলব্ধি করছে, তার চেয়ে বেশি ভোগ করছে তার প্রতিরূপকে। আমরা ঘটনা নয়, ঘটনার উপস্থাপনাকে; জীবন নয়, জীবনের প্রদর্শনকে; সত্য নয়, সত্যের দৃশ্যমান সংস্করণকে বেশি গুরুত্ব দিতে শিখেছি।
ফরাসি চিন্তক গাই ডেবোর্ড এই বাস্তবতাকে বলেছিলেন Society of the Spectacle—দৃশ্যতামাশার সমাজ। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজে বাস্তব অভিজ্ঞতার জায়গা দখল করে নিয়েছে তার উপস্থাপিত রূপ। মানুষ ক্রমশ বাস্তবতার সঙ্গে নয়, বরং বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি ও প্রদর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করছে।
এই বাস্তবতায় চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কেবল একটি সাংস্কৃতিক চর্চা নয়; এটি সমকালীন দৃশ্যতামাশানির্ভর সভ্যতার বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধী সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র।
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন নিছক ভালো সিনেমা দেখার কাজ নয়; বরং বাজার, রাষ্ট্র এবং প্রপাগান্ডামূলক সংস্কৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের সাংস্কৃতিক কল্পনাকে পুনর্গঠনের একটি পরিসর। আধুনিক প্রযুক্তি ও পুঁজিবাদ যেভাবে মানুষকে মুনাফার কাঁচামাল হিসেবে দেখে, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রও সেভাবে দর্শককে নিছক ভোক্তা হিসেবে বিবেচনা করে। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন এই যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে এবং মানুষকে আবার চিন্তার দিকে ফিরিয়ে নিতে চায়।
আজকের মানুষ শুধু দেখানো এবং দৃশ্যমান হওয়ার চাপে বাস করে। সামাজিক স্বীকৃতি, জনপ্রিয়তা এবং উপস্থিতির প্রতিযোগিতায় ব্যক্তি ক্রমাগত নিজেকেই একটি প্রদর্শনযোগ্য বস্তুতে পরিণত করছে। চলচ্চিত্র সংসদগুলো এই তাৎক্ষণিক উত্তেজনার মাধ্যম নয়; বরং মনোযোগ, চিন্তা ও আত্মসমালোচনার ক্ষেত্র। বাণিজ্যিক দৃশ্যসংস্কৃতি যেখানে দ্রুত আবেগ, দ্রুত সমাধান এবং পূর্বনির্ধারিত আদর্শ তৈরি করে, সেখানে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ধৈর্য, নীরবতা, মনন এবং দার্শনিক অনিশ্চয়তাকে প্রশ্রয় দেয়।
ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন দৃশ্যতামাশার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে “ধীর দেখা”-র এক সাংস্কৃতিক রাজনীতি গড়ে তুলতে চায়। মানুষ যখন ধীরে ধীরে দেখে এবং ধীরে ধীরে ভাবতে শেখে, তখন সে স্মৃতি তৈরি করে, অভিজ্ঞতাকে আত্মস্থ করে এবং বাস্তবতার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে। এই ধীর দেখাই মানুষকে দৃশ্যের ভোক্তা থেকে চিন্তার অংশগ্রহণকারীতে রূপান্তরিত করতে পারে।
জার্মান-মার্কিন দার্শনিক হার্বার্ট মার্কিউস আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজকে “একমাত্রিক সমাজ” হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর মতে, এই সমাজ মানুষকে এমনভাবে গড়ে তোলে যাতে সে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে কল্পনা করার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে। ফলে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কাজ কেবল বিকল্প চলচ্চিত্র প্রদর্শন নয়; বরং বিকল্প সংবেদনশীলতা, বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিকল্প কল্পনাশক্তি তৈরি করা।
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অবদান হলো—এটি মানুষকে আবার দেখতে শেখায়। শুধু চোখ দিয়ে নয়, চিন্তা দিয়ে; শুধু বিনোদনের জন্য নয়, আত্ম-অন্বেষণের জন্য; শুধু বাস্তবতাকে গ্রহণ করার জন্য নয়, তাকে প্রশ্ন করার জন্য। এ কারণেই চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন কেবল একটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং মুক্তচিন্তা, সমালোচনামূলক বোধ এবং মানবিক কল্পনাশক্তির এক অপরিহার্য সামাজিক বিদ্যালয়।
ফরাসি দার্শনিক জ্যাক র্যান্সিয়ার-এর মতে, নতুন সাংস্কৃতিক রাজনীতি শুরু হয় “বোধের বণ্টন” পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে। অর্থাৎ কে দৃশ্যমান হবে, কোন কণ্ঠ শোনা যাবে, কোন চিন্তা গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হবে—এসবই রাজনৈতিক প্রশ্ন। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন সেই আধিপত্যশীল দৃশ্যমানতার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি প্রান্তিক মানুষ, নীরব ইতিহাস, নিভৃত স্মৃতি এবং উপেক্ষিত কল্পনাশক্তিকে দৃশ্যমান করে তোলে।
এই কারণেই কোরিয়ার চলচ্চিত্র, ইরানি চলচ্চিত্র, ফিলিপিনো চলচ্চিত্র, লাতিন আমেরিকার স্বাধীন চলচ্চিত্র, আফ্রিকার উপনিবেশ-উত্তর চলচ্চিত্র কিংবা দক্ষিণ এশীয় সমান্তরাল চলচ্চিত্র এই আন্দোলনের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো কেবল চলচ্চিত্র নয়; এগুলো পৃথিবীকে অন্যভাবে দেখার ভাষা।
অতএব, চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন শুধুমাত্র চলচ্চিত্রপ্রেমীদের একটি সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নয়; এটি দেখার ক্ষমতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং বিকল্পভাবে কল্পনা করার স্বাধীনতাকে পুনরুদ্ধারের এক সামাজিক ও বৌদ্ধিক আন্দোলন। দৃশ্যতামাশার যুগে মানুষের সংবেদনশীলতা, স্মৃতি, মনন ও সমালোচনামূলক চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ ধরনের আন্দোলনের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।