মঞ্চের আলো থেকে কারাগারের অন্ধকার: একজন শিল্পীর নিভতে থাকা জীবনের গল্প

জাকির হোসেন

যে মানুষটা সারা জীবন আলো ফেরি করে বেড়াল, দিনশেষে তার ভাগ্যেই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে ঘন অন্ধকারটা জমা থাকে।” টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক অতি পরিচিত, চিরচেনা মুখ ইকবাল হোসেন আলী। যিনি মঞ্চের আলো-ঝলমলে চাদরে জড়িয়ে মানুষকে আনন্দ দেওয়াটাকে নিজের নেশা আর পেশা বানিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে তিনি টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী সংকেত নাট্যদল’-এর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। ৫১টি নাটকের পাঁচ শতাধিক মঞ্চায়নে যাঁর পায়ের ধুলো পড়েছে, যাঁর অভিনয়ে হলভর্তি মানুষ কখনো হেসেছে, কখনো বা চোখের জল ফেলেছে—সেই মানুষটি আজ চার দেয়ালের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দী। তিনি এখন একাকী লড়ছেন দুটি কঠিন লড়াই—একটি মরণব্যাধি ক্যান্সারের সঙ্গে, অন্যটি একটি হত্যা মামলায় আসামী হওয়ার সঙ্গে।

গত ১১ই জুন যখন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করতে আসে, তখন চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন এক নিমেষে থমকে গিয়েছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মির্জাপুরের একটি হত্যা মামলায় (মামলা নং ১৬৬/২৪) তাঁকে ৯০ নম্বর আসামি করা হয়েছে। অথচ নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থল থেকে ছিলেন বহু দূরে। এমনকি ওই মামলার বাদি মো. সুমন কিংবা মামলার এজাহারে উল্লেখিত ঘটনার সঙ্গে তাঁর দূরতম কোনো সংযোগই নেই।

এই প্রতিবেদকের হাতে থাকা নোটারি পাবলিকের হলফনামা (রেজি. নম্বর ১০৯২, তারিখ ০২ মার্চ ২০২৫) একটি জ্বলজ্বলে সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করায়। সেখানে মামলার বাদি মো. সুমন স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন— তথ্যগত ভুলের কারণে বর্ণিত ইকবাল হোসেন আলীকে আসামি করা হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে সে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না বলে আমি নিশ্চিত হইয়াছি।”

বাদি আরও উল্লেখ করেছেন যে, ইকবাল হোসেন আলীর বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল বা অন্য কোনো থানায় অতীতে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, এমনকি বাদি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চেনেনই না।

বাদি যেখানে নিজে দায়মুক্তি চেয়ে আবেদন করেছেন, সেখানে এই গ্রেপ্তার কেন? এই প্রশ্ন আজ টাঙ্গাইলের ৫০টিরও অধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কণ্ঠে ক্ষোভ ও বিস্ময় হয়ে ঝরে পড়ছে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর স্বজনেরা পুলিশের কাছে সমস্ত চিকিৎসাপত্রসহ নির্দোষিতার প্রমাণ উপস্থাপন করলেও, পুলিশ তা আমলেই নেয়নি।

গ্রেফতারের ভয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল এই নাট্যজনকে। আর এই পালিয়ে বেড়ানোর দিনগুলোতে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে। স্কয়ার হাসপাতাল ও খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজের সর্বশেষ মেডিকেল রিপোর্ট বলছে, তাঁর শরীরের অবস্থা এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন। এই শারীরিক অবস্থায় তাঁকে কারাগারে বন্দি রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন বলে মনে করছেন আইন ও মানবাধিকার কর্মীরা।

ইকবাল হোসেনের মুক্তি চেয়ে ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন উপদেষ্টা এবং জেলা প্রশাসনের কাছে যৌথ আবেদন জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাঁদের মতে, একজন নিবেদিতপ্রাণ শিল্পীর বিরুদ্ধে এমন মামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা গভীর কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ, যা কেবল একজন মানুষকে নয়, বরং পুরো সাংস্কৃতিক সমাজকেই হেয় প্রতিপন্ন করছে।

আকাশে যখন মেঘ জমে, মানুষ তখন বৃষ্টির অপেক্ষা করে। ইকবাল হোসেনের স্ত্রী ও পরিবার এখন চাতক পাখির মতো আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, দেশে আইনের শাসন যেখানে প্রতিষ্ঠিত, সেখানে একজন ক্যানসার আক্রান্ত নির্দোষ শিল্পী নিশ্চয়ই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন না।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং এবং জেলা পাবলিক লাইব্রেরীর আজীবন সদস্য টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রটি কি তবে কোনো অন্ধ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে অকালেই নিভে যাবে? নাকি রাষ্ট্র ও আদালত তাঁর নির্দোষিতার প্রমাণ যাচাই করে তাঁকে ফিরিয়ে দেবে তাঁর চেনা মঞ্চে, চেনা মানুষের কাছে? কারাগারের লোহার শিকের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা এক ক্যানসার আক্রান্ত শিল্পী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন।

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *