ধর্ষণ ও সহিংসতায় নরওয়ের রাজকুমারের সৎপুত্রের ৪ বছরের কারাদণ্ড

 

রাজপরিবারের জৌলুস আর রাজকীয় জীবনের চাকচিক্যের আড়ালে যে অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। ২০০১ সালে নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্স হাকোন এবং ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-ম্যারিটের বিয়ে যখন সারা বিশ্বের মিডিয়ার শিরোনাম হয়ে উঠেছিল, তখন সেই বিয়েকে অনেকটা ‘রূপকথার গল্প’-এর সাথে তুলনা করা হয়েছিল। কিন্তু আজ, ২৫ বছর পর, সেই রূপকথার চিত্রনাট্য সম্পূর্ণ ভিন্ন মোড় নিয়েছে। ধর্ষণ, ঘরোয়া সহিংসতা এবং মাদক পাচারের গুরুতর অভিযোগে নরওয়ের ক্রাউন প্রিন্সের সৎপুত্র মারিয়াস বোর্গ হইবি-কে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির আদালত। এই রায়ে একধাক্কায় আরও একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলো নরওয়ের রাজপরিবারের একসময়ের ‘নিখুঁত’ ভাবমূর্তি।

সোমবার (১৫ই জুন) অসলো জেলা আদালতের তিন বিচারকের বেঞ্চ সাত সপ্তাহ ধরে চলা এই আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করে। ২৯ বছর বয়সী মারিয়াস, যিনি ২০০১ সালে তার মায়ের রাজকীয় বিয়ের মাধ্যমে রাজপরিবারের সদস্য হন, আজ আদালতে একজন দোষী আসামী হিসেবে সাবস্ত্য হলেন।

আদালতে মারিয়াসের বিরুদ্ধে মোট ৪০টি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ৩৪টি অভিযোগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দুটি ধর্ষণ, সাবেক এক প্রেমিকার ওপর ঘরোয়া সহিংসতা এবং মাদক বহন ও সরবরাহের অভিযোগ। তবে বাকি দুটি ধর্ষণের অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালত তাকে চার বছরের কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করে।

উল্লেখ্য, ধর্ষণের দুটি ঘটনার একটি ঘটেছিল সরাসরি ক্রাউন প্রিন্সের সরকারি বাসভবনের বেসমেন্টে, যা রাজপরিবারের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর একটি বিষয়।

রাষ্ট্রপক্ষ মারিয়াসের সাত বছর সাত মাসের কারাদণ্ড চেয়েছিল। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, চারজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে মারিয়াসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোতে ভুক্তভোগীরা পার্টিতে যোগ দেওয়ার পর এতটাই অচেতন বা অসুস্থ ছিলেন যে তারা মারিয়াসের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি।

রায় ঘোষণাকালে বিচারক জন স্ভেরদ্রুপ এফজেস্টাদ বলেন, “ক্রাউন প্রিন্সের বাসভবনে সংঘটিত ধর্ষণের ঘটনায় আদালত প্রমাণিত হয়েছে বলে মনে করে যে, ভুক্তভোগী নারী ওই কাজের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোনো সক্ষমতাই রাখেন না।”

রায় ঘোষণার পর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি স্টুরলা হেনরিকসবোয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “এটি আমাদের বিচার ব্যবস্থার একটি বড় বিজয়। কেউ যদি গুরুতর অপরাধ করে, তবে সে কে বা সে কার পরিবারের সদস্য, তার ভিত্তিতে সে কোনোভাবেই পার পেতে পারে না।”

মারিয়াস বোর্গ হইবি ক্রাউন প্রিন্সেস মেটে-ম্যারিটের প্রথম পক্ষের সন্তান। ২০০১ সালে যখন তার মায়ের সাথে ক্রাউন প্রিন্স হাকোনের বিয়ে হয়, তখন চার বছর বয়সী সোনালী চুল আর নীল চোখের এই শিশুটি ‘লিটল মারিয়াস’ নামে সারা বিশ্বে পরিচিতি পায়। রাজকীয় জীবনের শুরুতে তাকে নিয়ে রাজপরিবারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হলেও বড় হয়ে তিনি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। গত কয়েক বছর ধরে তার বিরুদ্ধে একাধিকবার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, যা রাজপরিবারের জন্য ক্রমাগত মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই রায়ের পর রাজপরিবারের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে রাজপ্রাসাদ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। রাজপ্রাসাদের এক মুখপাত্র শুধু বলেন, “বিষয়টি আদালত কর্তৃক বিবেচিত হয়েছে, এবং ফলাফল সম্পর্কে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।” অতীতে রাজপরিবার এই মামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি জানালেও, রায়ের দিন তারা নীরবতা বেছে নেয়।

নরওয়ের রাজপরিবারের ভাবমূর্তি এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছে, কিন্তু ক্রাউন প্রিন্সের সরাসরি পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং কারাদণ্ডের ঘটনাটি দেশটিতে এক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতিটি নরওয়ের আদালত আজ আবারও প্রমাণ করল। নাম, পদবি বা রাজকীয় রক্তের সম্পর্ক কাউকে গুরুতর অপরাধের শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তবে এই রায় যে নরওয়ের রাজপরিবারের ‘রূপকথার’ গল্পে এক কালো অধ্যায় যোগ করল, তা বলাই বাহুল্য। ‘লিটল মারিয়াস’ থেকে ‘দোষী মারিয়াস’—এই পথচলা এখন কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, বরং রাজকীয় জৌলুসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতার এক নির্মম দলিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *