লেখক ও সাংবাদিক ফরহাদ সাফায়েতুল কবীর অভিযোগ করেছেন, দিনাজপুরে একটি জমি ও বাড়িকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিরোধে এক বিচারক তাঁর বাড়িওয়ালার পরিবারকে রক্ষা করতে বিচারিক প্রভাব খাটাচ্ছেন এবং নানা কৌশলে তাঁর পরিবারকে হয়রানির মুখে ফেলছেন।
ফরহাদ সাফায়েতুল কবীর, যিনি বিভিন্ন পত্রিকায় ‘বিজয় মজুমদার’ ছদ্মনামে লেখালেখি করেন, জানান যে তাঁর স্ত্রী ও স্ত্রীর তিন বোন দিনাজপুর শহরের বড়পুল এলাকায় একটি জমি কিনে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেন। তাঁদের দাবি, জমিটি তারা স্থানীয় ১২ নম্বর ওয়ার্ডের যুবলীগ নেত্রী ফারজানা রীমার কাছ থেকে ক্রয় করেছিলেন।
ফরহাদের অভিযোগ, বাড়ি নির্মাণের পর ফারজানা রীমা তাঁর চাচা ইউসুফ আলীর পরামর্শে জমি দখলের অভিযোগ তুলে জমির ক্রেতাদের কাছে অর্থ দাবি করেন। ক্রেতারা সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে আইনজীবী রীমা ও তাঁর বোন ওই পরিবারের চার বোন এবং তাঁদের স্বজনদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে তিনটি মামলা দায়ের করেন। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়। ফরহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দাবিকৃত অর্থ পরিশোধ না করলে জেলে পাঠানো, সরকারি চাকরি নষ্ট করা এবং পৌরসভার মাধ্যমে বাড়ি ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
ফরহাদ সাফায়েতুল কবীর, তাঁর স্ত্রী এবং স্ত্রীর তিন বোনের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি মামলায় আদালত অব্যাহতি প্রদান করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, এরপর ফারজানা রীমার চাচা ইউসুফ আলী তাঁদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও হয়রানি করতে শুরু করেন।
ফরহাদের দাবি, যখন ইউসুফ আলী বুঝতে পারেন যে রীমা মামলাগুলোতে সুবিধা করতে পারছেন না, তখন তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেন, “বের হবি তো আমার বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে, তখন তোদের কে বাঁচাবে?”
পরবর্তী সময়ে এক প্রতিবেশী নারীকে গালমন্দ করার ঘটনায় ওই নারীর পক্ষ নেওয়ায় ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ফরহাদ ও তাঁর স্ত্রীকে নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্যে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ফরহাদ দাবি করেন, এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে তাঁকে জানানো হয় যে ওই বাড়িতে ভাড়া থাকা একজন বিচারক থানাকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তাঁর মামলা গ্রহণ করা না হয়।
অভিযোগে বলা হয়, ঘটনার পর ইউসুফ আলী ফরহাদ ও তাঁর স্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। সেই মামলায় সোনালী ব্যাংকের এক কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনার সময় সিলেটে অবস্থানরত দিনাজপুর সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মুনছুরা পারভীন এবং তাঁর স্বামী জাহিদুল ইসলামের নামও আসামির তালিকায় যুক্ত করা হয়।
ফরহাদের অভিযোগ, ইউসুফ আলীর ভাড়াটিয়া বিচারক ইব্রাহিম আলী মামলাটি সরাসরি বিচারক সামিউল ইসলামের আদালতে গ্রহণের জন্য অনুরোধ করেন। তাঁর দাবি, রাত সাড়ে আটটা থেকে নয়টার মধ্যে মামলাটি গ্রহণ করা হয় এবং বিচারক ইব্রাহিম আলী আদালতের জিআরওর মাধ্যমে সেটিকে দ্রুত থানায় এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
ফরহাদের আরও অভিযোগ, মামলার বাদী এবং বিচারক ইব্রাহিম আলী তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন যাতে মামলার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তদন্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলের বাস্তবতা যাচাই করে দেখতে পান যে মামলার এজাহারে নাম থাকা মুনছুরা পারভীন ও জাহিদুল ইসলাম ঘটনাস্থল থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে তিনি কাউকে গ্রেপ্তার না করেই ফিরে যান ।
ফরহাদ মনে করেন, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা যদি নিরপেক্ষ না হতেন, তাহলে তিনি নিজে, তাঁর স্ত্রী রেজিয়া সুলতানা, মুনছুরা পারভীন এবং জাহিদুল ইসলাম—কেউই অপরাধে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও কারাগারে যেতে পারতেন। তাঁর মতে, এর পেছনে কাজ করেছে একজন বিচারকের বাড়িওয়ালার পরিবারকে রক্ষা করার চেষ্টা।
ফরহাদের অভিযোগ অনুযায়ী, বিচারক ইব্রাহিম আলী এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি সিনিয়র বিচারক সামিউল ইসলামকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে আসামিরা জামিন নিতে এলে তাঁদের জামিন না দেওয়া হয়। তবে মামলাটি গ্রহণ করা হলেও বিচারক সামিউল ইসলাম সেই অনুরোধ অনুসরণ না করে আসামিদের জামিন মঞ্জুর করেন।
এদিকে ফরহাদ পাল্টা মামলা দায়ের করার পরও বিচারক ইব্রাহিম আলী বাড়িওয়ালার পরিবারকে রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফরহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি গোপন সূত্রে জানতে পেরেছেন যে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মমিনুর রহমানের মাধ্যমে এমন একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে, যাতে উভয় পক্ষের মামলাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাঁর দাবি, তদন্ত কর্মকর্তা উভয় পক্ষকেই দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করলেও ভিডিও ফুটেজে মারধরের দৃশ্য থাকার পরও মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ইউসুফ আলীর ছেলে মোহাম্মদ ইয়াদকে নির্দোষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ফরহাদের অভিযোগ, তিনি ওই তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে কৌশলে তাঁকে আদালতে অনুপস্থিত দেখানো হয় এবং মামলাটি গ্রাম আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর মতে, এর ফলে ইউসুফ আলী, তাঁর ছেলে ইয়াদ এবং স্ত্রী হোসনে আরা গুরুতর অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা পান।
ফরহাদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের ঘটনা অভিযুক্তদের আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে। তাঁর দাবি, ইউসুফ আলী ও ইয়াদ প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন যে কোনো মামলাই তাঁদের আটকাতে পারবে না এবং ভবিষ্যতে তাঁরা আরও কঠোর পদক্ষেপ নেবেন।
প্রসঙ্গত, বিচারক ইব্রাহিম আলীর বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। ফরহাদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অভিযোগ ছিল যে স্বৈরাচার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তিনি তাঁর আদালত থেকে সবচেয়ে বেশি জামিন দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফরহাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সাংবাদিকের লেখার সূত্র ধরে বিচারক ইব্রাহিম আলী দিনাজপুরের পার্বতীপুর এলাকার সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া একই সময়ে আওয়ামী লীগের এক গ্রেপ্তারকৃত কর্মীর অভিযোগের ভিত্তিতে দিনাজপুর সদর থানার তৎকালীন ওসি মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা গ্রহণ করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তবে সেই অভিযোগ এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিচারক ইব্রাহিম আলী, ইউসুফ আলী, ফারজানা রীমা, তদন্ত কর্মকর্তা মমিনুর রহমান কিংবা সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।