উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং সফর করছেন সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. বিবিয়ান বালাকৃষ্ণণ। গত এক দশকের মধ্যে এটি সিঙ্গাপুরের কোনো শীর্ষ পর্যায়ের নেতার প্রথম উত্তর কোরিয়া সফর। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফর শুধু দুই দেশের সম্পর্কের জন্য নয়, বরং এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
বালাকৃষ্ণণের পাঁচ দিনের আঞ্চলিক সফর শুরু হয় ২৪শে মে। সফরের প্রথম গন্তব্য ছিল চীনের রাজধানী বেইজিং। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর তিনি উত্তর কোরিয়ার পিয়ংইয়ং সফরে যান। সফরের শেষ ধাপে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউল সফর করবেন।
বেইজিং বৈঠকে সিঙ্গাপুর ও চীন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির পক্ষে অবস্থান নেয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সমুদ্র ও আকাশপথে অবাধ চলাচলের গুরুত্ব তুলে ধরে দুই দেশ।
উত্তর কোরিয়ায় বালাকৃষ্ণণের এই সফর বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ২০১৮ সালের একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে। সে বছরও তিনি পিয়ংইয়ং সফর করেছিলেন। ওই সফরের অল্প সময় পর সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বহুল আলোচিত শীর্ষ বৈঠক। সেই বৈঠক বিশ্ব কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
সিঙ্গাপুর ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সীমিত হয়ে পড়েছে। তবুও যোগাযোগ বজায় রেখেছে উভয় দেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সফরের অন্যতম গুরুত্ব কোরীয় উপদ্বীপের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সঙ্গে একই সফরে যোগাযোগ স্থাপন। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ খুবই সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুর ভবিষ্যতে একটি সম্ভাব্য সংলাপের সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সিঙ্গাপুর সরকার এখন পর্যন্ত কোনো মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি। দেশটি বরাবরই সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সফর এশিয়ার নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতার মধ্যে অনেক দেশই নিজেদের কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর চেষ্টা করছে। সিঙ্গাপুরও সেই কৌশলের অংশ হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি লাতিন আমেরিকার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে। পাশাপাশি পূর্ব আফ্রিকায় প্রথম দূতাবাস স্থাপনের পরিকল্পনাও নিয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ কোরিয়া সিঙ্গাপুরের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দুই দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো একজন সিঙ্গাপুরি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সরকারি সিউল সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে নতুন গতি দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য এখন সীমিত থাকলেও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে সিঙ্গাপুরের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি সিঙ্গাপুরের ‘ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির’ একটি উদাহরণ। আয়তনে ছোট হলেও দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
তাদের মতে, এই সফর থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় চুক্তি না এলেও ভবিষ্যতের সংলাপ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে পিয়ংইয়ং সফর দেখিয়ে দিল, ছোট রাষ্ট্রও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর সেই কারণেই বিবিয়ান বালাকৃষ্ণণের এই সফরকে অনেকেই এশিয়ার পরিবর্তিত কূটনৈতিক মানচিত্রের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন।