কুমিল্লা লজের সম্পত্তি উদ্ধার ও ভবন সংস্কারের আশ্বাস এমপি মনিরুল হক চৌধুরীর

কুমিল্লায় বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কুমিল্লা লজের ১৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানবকল্যাণ, আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার (৪ঠা জুন) বিকেলে কুমিল্লা ক্লাব মিলনায়তনের ৫ম তলায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

“সত্যের চেয়ে উচ্চতর ধর্ম নেই”— এই মূলমন্ত্রকে ধারণ করে আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, শুভেচ্ছা বিনিময়, সম্মাননা প্রদান এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সোসাইটির সদস্য, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন অংশ নেন।

জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে আলোচনা পর্ব শুরু করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৩৮ বছর ধরে মানবকল্যাণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নৈতিক চেতনা বিকাশে কাজ করে আসা থিওসোফিক্যাল সোসাইটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রতিষ্ঠান। এর ঐতিহ্য ও সম্পদ সংরক্ষণে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

তিনি জানান, কুমিল্লা লজের বেদখল হওয়া জমি ও সম্পত্তি উদ্ধারে উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করে সদস্য ও দর্শনার্থীদের জন্য ব্যবহার উপযোগী করার আশ্বাস দেন। কুমিল্লার উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন এবং কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবির কথাও উল্লেখ করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্সিয়াল রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বে সহিংসতা ও বিভাজন বাড়ার প্রেক্ষাপটে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির দর্শন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার ভেদাভেদ ভুলে মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য।

অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা, ইউনাইটেড রিলিজিয়ন্স ইনিশিয়েটিভ (ইউআরআই)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ধর্মতত্ত্ব গবেষক ও গ্রন্থকার ড. মোহাম্মদ আবদুল হাই বলেন, থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতবাদের সংগঠন নয়। এটি জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে মানবকল্যাণে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক আন্দোলন। তিনি নতুন প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

এছাড়া কুমিল্লা বারের সিনিয়র আইনজীবী মো. গোলাম ফারুক, নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী এবং আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমন বক্তব্য দেন। তারা বলেন, নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিভাজনের সময়ে মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও জ্ঞানচর্চা প্রসারে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির মতো সংগঠনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আলোচনা সভার আগে প্রধান অতিথি মনিরুল হক চৌধুরী এবং বিশেষ অতিথি সুব্রত চৌধুরী কুমিল্লা লজ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সম্পত্তি সংরক্ষণ, সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নতুন প্রজন্মকে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

আয়োজকরা জানান, মানবকল্যাণ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শ প্রচারে থিওসোফিক্যাল সোসাইটি গত ১৩৮ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। জ্ঞানচর্চা, নৈতিক শিক্ষা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং মানবিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনটি শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে।

আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংগীত ও অন্যান্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও সুধীজনরা কুমিল্লা লজের উত্তরোত্তর সাফল্য এবং মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

১৩৮ বছরের ঐতিহ্য, সত্যের অনুসন্ধান, মানবতার সেবা এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকারকে সামনে রেখে উদযাপিত এ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল একটি আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান ছিল না; বরং এটি ছিল মানবিক মূল্যবোধ, সম্প্রীতি, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক মিলনমেলা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *