‘রইদ’ নিয়ে তুমুল আলোচনা: মিথ, ধর্ম, লোকজ বিশ্বাস নাকি মানুষের অন্তর্গত অন্ধকারের গল্প?

আমজাদ সুমন

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে খুব কম সিনেমাই মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে এত বৈচিত্র্যময় আলোচনা তৈরি করতে পারে, যতটা করেছে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন নির্মিত নতুন চলচ্চিত্র ‘রইদ’। সিনেমাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, চলচ্চিত্রবিষয়ক ফোরাম এবং দর্শক মহলে চলছে বিস্তর বিশ্লেষণ, বিতর্ক ও ব্যাখ্যা।

অনেক দর্শকের মতে, ‘রইদ’ শুধুমাত্র একটি গল্প নয়; বরং এটি ধর্মীয় প্রতীক, লোকজ বিশ্বাস, মিথোলজি এবং মানব মনের গভীর স্তরের একটি শৈল্পিক উপস্থাপন। আবার অন্য একদল দর্শক মনে করেন, সিনেমাটি অত্যধিক প্রতীকনির্ভর হওয়ায় এর মূল বক্তব্য অনেকের কাছে অস্পষ্ট থেকে গেছে।

মেজবাউর রহমান সুমনের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হাওয়া মুক্তির পর থেকেই তাকে ভিন্নধর্মী নির্মাতা হিসেবে দেখা হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘হাওয়া’য় তিনি বাংলা লোককথা ও মিথকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করেছিলেন।

‘রইদ’ নিয়েও একই ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। দর্শকদের একটি অংশ মনে করছেন, সিনেমাটির কেন্দ্রে রয়েছে হিব্রু মিথোলজির রহস্যময় চরিত্র লিলিথের ধারণা। তাদের মতে, ছবির নামহীন নারী চরিত্র, তার অস্বাভাবিক আচরণ, বারবার ফিরে আসা এবং রহস্যময় উপস্থিতি লিলিথ মিথের সঙ্গে নানা স্তরে সম্পর্ক তৈরি করে।

সিনেমার প্রধান চরিত্র সাদু এবং তার স্ত্রীকে ঘিরেই এগিয়েছে পুরো কাহিনি। ছবিতে বারবার ফিরে আসে তাল, তালের পিঠা, ঝড়, বৃষ্টি, ছাগল, গবাদিপশু, গর্ভধারণ এবং প্রকৃতির নানা উপাদান।

অনেক দর্শক এসব উপাদানকে বাইবেলের আদম-হাওয়া, গন্ধম ফল, খ্রিস্টীয় ‘সেভেন সিনস’, বাউল দর্শনের দেহতত্ত্ব, এমনকি পুনর্জন্ম ও চক্রাকার জীবনের ধারণার সঙ্গে যুক্ত করে দেখছেন।

চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ‘রইদ’ মূলত মানুষের ভেতরের লোভ, কামনা, সন্দেহ, আসক্তি ও আত্মবিনাশের গল্প। এখানে সাদুর চরিত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং তার জীবন এক ধরনের নৈতিক ও মানসিক অবক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচনায় কেউ কেউ দাবি করেছেন, ছবির নারী চরিত্রটি লিলিথের প্রতীক হতে পারে। তবে অন্যদের মতে, নির্মাতা ইচ্ছাকৃতভাবেই কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ‘রইদ’ নারী-পুরুষ সম্পর্ক, ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্ক, অথবা সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির সম্পর্ক— সবকিছুরই প্রতীকী রূপ হতে পারে।

সিনেমাটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উন্মুক্ত ব্যাখ্যার সুযোগ। ফলে একেক দর্শক একেকভাবে সিনেমাটিকে দেখছেন।

‘রইদ’-এর সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত দিকগুলোর একটি হলো অভিনেত্রী নাজিফা তুষির অভিনয়। অনেক সমালোচকের মতে, এটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

অন্যদিকে মোস্তাফিজুর নূর ইমরান অভিনীত সাদু চরিত্রটিও দর্শকদের নজর কেড়েছে।

চিত্রগ্রাহক জোহায়ের মুসাব্বির সুনামগঞ্জের প্রকৃতি, ঋতু পরিবর্তন, নদী, আকাশ, ঝড়-বৃষ্টি ও গ্রামীণ জীবনকে যে নান্দনিকতায় পর্দায় তুলে ধরেছেন, তা ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছে। একইভাবে সংগীত পরিচালক শোয়াইবের আবহসংগীতও চলচ্চিত্রটির আবহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মত দিয়েছেন দর্শক ও সমালোচকরা।

তবে সিনেমাটি নিয়ে সমালোচনাও কম নয়। অনেকের অভিযোগ, ছবিটি অত্যধিক প্রতীকনির্ভর এবং জটিল। ফলে সাধারণ দর্শকের জন্য গল্পের মূল স্রোত অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

কিছু সমালোচকের মতে, ছবির ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্য ও প্রতীকী ভাষা অনেক শক্তিশালী হলেও এর বর্ণনাভঙ্গিতে স্পষ্টতার ঘাটতি রয়েছে। আবার অন্যদের মতে, এই অস্পষ্টতাই ‘রইদ’-এর প্রধান শক্তি।

‘রইদ’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা দর্শকদের স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। একদল এটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সাহসী ও শৈল্পিক বাংলাদেশি চলচ্চিত্র হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে আরেকদল মনে করছেন, এটি একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু অসম্পূর্ণ নির্মাণ।

তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত— ‘রইদ’ দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে। সিনেমা শেষ হওয়ার পরও এর চরিত্র, প্রতীক ও রহস্যময় ঘটনাগুলো দর্শকের মনে দীর্ঘ সময় ধরে ঘুরতে থাকে।

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে এমন আলোচনাসৃষ্টিকারী কাজ খুব ঘন ঘন আসে না। সেই অর্থে ‘রইদ’ ইতোমধ্যে নিজস্ব একটি জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *