ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আসন হারালো জার্মানি

— ইসরাইল-নীতিই কি বড় কারণ?

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক গুরুত্বপূর্ণ ভোটে বিরল পরাজয়ের মুখে পড়েছে জার্মানি। পশ্চিম ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের জন্য নির্ধারিত দুটি অস্থায়ী আসনের নির্বাচনে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে ব্যর্থ হয়েছে দেশটি। এর ফলে আসন দুটি পেয়েছে অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল।

ভোটে জার্মানি ১০৪টি ভোট পেয়েছে। নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অর্থাৎ ১২৭ ভোট। প্রয়োজনীয় ভোটের তুলনায় ২৩ ভোট কম পাওয়ায় আসন হারাতে হয়েছে বার্লিনকে।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়। বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জার্মানির বর্তমান অবস্থান নিয়ে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মনোভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।

দশকের পর দশক ধরে প্রায় নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফোরামে প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে জার্মানি। প্রতি আট বছর অন্তর সাধারণ পরিষদের এই আসন লাভ করা দেশটির জন্য প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এবার সেই ধারায় ছেদ পড়ল।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোহান ওয়াডেফুল স্বীকার করেছেন যে দেশের কিছু বৈদেশিক নীতি ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।

তার ভাষায়, জার্মানি এমন কিছু বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে সব সদস্য রাষ্ট্র একমত নয়। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্টের ঐতিহাসিক স্মৃতির কারণে ইসরাইলের প্রতি জার্মানির বিশেষ দায়বদ্ধতাও ভোটে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, জার্মানির পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ গাজা যুদ্ধ ও ইসরাইল প্রশ্নে তার অবস্থান।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেস্পন্সিবল স্টেটক্রাফটের নির্বাহী সহ-সভাপতি ত্রিতা পারসি বলেছেন, জার্মানির পরাজয়ের সঙ্গে ইউক্রেন নীতির সম্পর্ক খুবই সীমিত। তার মতে, মূল বিষয় ছিল গাজা যুদ্ধ এবং ইসরাইলের প্রতি বার্লিনের অবস্থান।

পারসি বলেন, অস্ট্রিয়া ও পর্তুগালও ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিমা অবস্থানের কাছাকাছি। ফলে জার্মানির ভোট হারানোর কারণ অন্যত্র খুঁজতে হবে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনারের কার্যালয়ের সাবেক কর্মকর্তা ক্রেইগ মোখিবারও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ফিলিস্তিন ইস্যু, মানবাধিকার প্রশ্ন এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে জার্মানির অবস্থান বহু দেশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জার্মানির অভ্যন্তরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে, অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হয়েছে।

এ সময় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে একাধিক প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। জার্মানি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকে। এর মধ্যে মানবিক যুদ্ধবিরতি ও অস্ত্রবিরতির আহ্বানসংক্রান্ত প্রস্তাবও ছিল।

এ ছাড়া ফিলিস্তিনের জাতিসংঘ সদস্যপদ-সংক্রান্ত ভোটেও জার্মানি সমর্থন দেয়নি।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস সম্প্রতি ইসরাইল সফর করেন। সেখানে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেন।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই বছরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গাজায় সম্ভাব্য গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে ইসরাইলকে পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

মেরৎস সফরের সময় স্পষ্ট করে বলেন, নিকট ভবিষ্যতে জার্মানির ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই।

এদিকে গাজায় ব্যবহারের জন্য অস্ত্র রপ্তানির ওপর আরোপিত তিন মাসের স্থগিতাদেশও জার্মানি তুলে নেয়। পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, স্থগিতাদেশ চলাকালেও অস্ত্র সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, দুই বিজয়ী দেশই নিজ নিজ কূটনৈতিক শক্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগিয়েছে।

পর্তুগাল দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগিজভাষী ও স্প্যানিশভাষী বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে দেশটির কূটনীতি তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ ও সংলাপনির্ভর বলে পরিচিত।

অন্যদিকে অস্ট্রিয়া সাংবিধানিকভাবে সামরিক নিরপেক্ষ দেশ। দেশটি ন্যাটোর সদস্য নয়। জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রও অবস্থিত ভিয়েনায়। ফলে বহু রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

অস্ট্রিয়া ইসরাইলের সমর্থক হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারা জার্মানির মতো সক্রিয়ভাবে ইসরাইলের নীতির পক্ষে অবস্থান নেয় না বলে অনেক পর্যবেক্ষকের মত।

ভোটের ফল প্রকাশের পর জার্মানির রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

ডানপন্থী দল AfD-এর নেতা আলিস ভেইডেল ফলাফলকে “লজ্জাজনক” বলে মন্তব্য করেছেন।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন এসপিডির রাজনীতিক আদিস আহমেতোভিচ বলেছেন, এই ভোট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জার্মানিকে কীভাবে দেখছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

চ্যান্সেলর মেরৎস ক্ষমতায় আসার সময় ইউরোপ ও বিশ্বমঞ্চে জার্মানির প্রভাব পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে এই পরাজয় সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই ভোট জার্মানির জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশটির অর্থনৈতিক শক্তি ও ইউরোপীয় নেতৃত্বের অবস্থান এখনো অটুট থাকলেও বহু রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

আগামী দিনে বার্লিন তার মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, কিংবা ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও সমসাময়িক কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য খুঁজে নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

জার্মানির এই পরাজয় তাই শুধু একটি আসন হারানোর ঘটনা নয়; বরং বিশ্ব রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান নিয়ে চলমান বিতর্কের নতুন অধ্যায়।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *