হিজবুল্লাহর ফাইবার-অপটিক ড্রোন: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষায় ফাটল

গত কয়েক মাস ধরে লেবাননের দক্ষিণে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর রাডার স্ক্রিনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে—ড্রোন শনাক্ত হচ্ছে, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামিং সিস্টেম সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও এই ড্রোনগুলো তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, হিজবুল্লাহ এখন ফাইবার-অপটিক কেবল-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ব্যবহার করছে, যা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের  নিয়মকানুন পাল্টে দিচ্ছে।

সাধারণত ড্রোন রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর অর্থ, শক্তিশালী জ্যামার দিয়ে সংকেত বিঘ্নিত করে ড্রোনকে নিষ্ক্রিয় করা যায়। কিন্তু ফাইবার-অপটিক কেবল-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন ভিন্ন—এগুলো পাতলা, অত্যন্ত সহনশীল ফাইবার-অপটিক তারের মাধ্যমে মাটি বা বাতাসে ভেসে থাকা একটি কেবলের সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে:

RF জ্যামিং অকার্যকর: কোনো রেডিও সংকেত নেই, তাই জ্যামার কী বিঘ্নিত করবে?
GPS স্পুফিং ব্যর্থ: স্যাটেলাইট সংযোগের প্রয়োজন হয় না।
লো-অল্টিটিউড পেনেট্রেশন: ড্রোনগুলো রাডারের নিচে উড়তে পারে, কেবলের সাহায্যে দূরবর্তী অপারেটরের কাছে রিয়েল-টাইম ভিডিও ফিড পাঠাতে পারে।

“এটি ড্রোন যুদ্ধের পরবর্তী ধাপ,” বলেন বেইরুতের আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ড. কারিম এল-মুসাউই। “হিজবুল্লাহ ইরান থেকে প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে, কিন্তু তারা এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।”

ইসরায়েল বিশ্বের সবচেয়ে ঘনীভূত বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটির অধিকারী—আইরন ডোম, ডেভিড স্লিং এবং আরো উন্নত রাডার নেটওয়ার্ক। কিন্তু এই সব সিস্টেম মূলত রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র এবং রেডিও-নিয়ন্ত্রিত ড্রোনের বিরুদ্ধে ডিজাইন করা।

ফাইবার-অপটিক ড্রোনের হুমকি তিনটি স্তরে কাজ করে:

গোয়েন্দা সংগ্রহ: ড্রোনগুলো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি, প্যাট্রোল রুট এবং বায়ু প্রতিরক্ষা ব্যাটারির অবস্থান চিত্রায়িত করতে পারে—কোনো ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর ছাড়াই।

কামিকাজে হামলা: ছোট আকারের ফাইবার-অপটিক ড্রোনে বিস্ফোরক বহন করে ট্যাংক, কমান্ড পোস্ট বা সেনা সমাবেশে আঘাত হানতে পারে। ২০২৩-২৪ সালে গাজায় হামাসের ড্রোন হামলাগুলোর মতো, কিন্তু আরও উন্নত।

স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্দেশনা: ড্রোনটি লক্ষ্য চিহ্নিত করে ফাইবার কেবলের মাধ্যমে তথ্য পাঠাতে পারে, যা দিয়ে পিছনের সারির ক্ষেপণাস্ত্র বা আর্টিলারি নির্দেশিত হয়।

তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের একজন গবেষক, যিনি গোপনীয়তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, “আমরা একটি নতুন ধরনের হুমকির মুখোমুখি। আমাদের ইলেকট্রনিক যুদ্ধের ক্ষমতা বিশ্বসেরা, কিন্তু সেটি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি-নির্ভর। যখন শত্রু রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে না, তখন আমাদের সেন্সর অন্ধ হয়ে যায়।”

ফাইবার-অপটিক নিয়ন্ত্রিত অস্ত্র নতুন নয়। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোনের সঙ্গে ফাইবার কেবল ব্যবহার শুরু করে—ইউক্রেনীয় জ্যামিং-এর বিরুদ্ধে। ইরান এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে এবং হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি বাহিনীগুলোতে স্থানান্তরিত করেছে।

তবে লেবাননের ভূগোল এই প্রযুক্তিকে আরও মারাত্মক করে তুলেছে। দক্ষিণ লেবাননের পাহাড়ি এলাকা এবং ঘন বনভূমি ড্রোন উৎক্ষেপণ এবং কেবল পরিচালনার জন্য আদর্শ জায়গা। হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের অনুশীলন—ইসরায়েলি বিমান হামলা এড়িয়ে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে অস্ত্র লুকিয়ে রাখা—এখন এই নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

“এটি শুধু একটি অস্ত্র নয়, এটি একটি দর্শন,” মন্তব্য করেন লেবাননের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হানা এলিয়াস। “হিজবুল্লাহ দেখাতে চায় যে, ইসরায়েলের প্রযুক্তিগত আধিপত্য চিরস্থায়ী নয়।”

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা শিল্প ইতোমধ্যে সমাধানের খোঁজ শুরু করেছে:

অপটিক্যাল ট্র্যাকিং: রাডারের পরিবর্তে উচ্চ-রেজোলিউশন ক্যামেরা এবং থার্মাল সেন্সর দিয়ে ড্রোন শনাক্তকরণ।
লেজার প্রতিরক্ষা: আইরন বীমের মতো লেজার সিস্টেম, যা দ্রুত গতির ছোট লক্ষ্য ধ্বংস করতে পারে।
কাউন্টার-ড্রোন ড্রোন: নিজস্ব স্বয়ংক্রিয় ড্রোন পাঠিয়ে শত্রু ড্রোনে আঘাত হানা।

কিন্তু এই সমাধানগুলো ব্যয়বহুল এবং ব্যাপকভাবে স্থাপন করতে সময় লাগবে। এর মধ্যে, হিজবুল্লাহর ফাইবার-অপটিক ড্রোন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মনোবল এবং কৌশলগত পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করছে।

ফাইবার-অপটিক ড্রোনের উত্থান মধ্যপ্রাচ্যের অসমমিত যুদ্ধের একটি বড় পরিবর্তন নির্দেশ করে। যেখানে একদিকে ইসরায়েলের বহুবিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অন্যদিকে হিজবুল্লাহর তুলনামূলক কম খরচে, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুদ্ধে অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত শক্তি সবসময় বিজয়ী হয় না—কখনও কখনও সৃজনশীলতা এবং প্রচলিত নিয়ম ভাঙার সাহস জয়ী হয়।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই বার্তা স্পষ্ট: ড্রোন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ এবং অস্ত্র প্রসারণ রোধের চেষ্টাগুলো প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। আজ যা লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে ঘটছে, তা আগামী দশকে বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলেও ঘটতে পারে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *