নুরুল আমিন
বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে বাংলা সাহিত্যাকাশে নজরুলের আবির্ভাব। আজন্ম দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবন তাঁর সৃষ্টিপথে বাধা হয়ে না দাঁড়ালেও ব্যক্তি জীবনকে সুস্থির হতে দেয়নি আদৌ। রক্তমাখা চলার পথের বিচিত্র অভিজ্ঞতার অনেকটাই তাঁর সৃষ্টিতে ছায়া ফেলেছে। সে পথপরিক্রমায় দেখা সামাজিক বৈষম্য, দুর্বলের ওপর সবলের পীড়ন, অত্যাচার, অনাচার, অন্ধত্ব, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, লৈঙ্গিক অসমতা এবং ঔপনিবেশিক ভেদনীতি তাঁকে ব্যথিত, মর্মাহত, ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ করেছে। আর বিক্ষুব্ধ চিত্তের শৈল্পিক প্রকাশ বিদ্রোহের অগ্নিঝরা বাণী হয়ে প্রবল করাঘাত করেছে সামাজিক অসাম্যের প্রাকারে। আবার মানবপ্রেমের অমেয় সুধা শান্ত রস সিঞ্চিত করে বিদ্রোহী সত্তায় যে পেলব প্রলেপ দিয়েছে, সেটিই তাঁর সৃজনে অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। “মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য”—এ তাঁর অন্তর্গত সত্তারই অনিবার্য প্রকাশ। অভিধা প্রদানে পটু বাঙালি পাঠক তাই তাঁর নামাগ্রে ‘বিদ্রোহী কবি’ কিংবা ‘প্রেমের কবি’র অভিধা এঁটে দেন।
তাঁর সৃষ্টিতে প্রেম বা বিদ্রোহ এসেছে মানবপ্রেম ও মানবমুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকে। অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন, নিষ্পেষণ ও বৈষম্যমুক্ত মানবিক সত্তা, সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের অভিপ্সায় তাঁর কাব্য আলোকাভিসারে নিমজ্জমান। মানুষের প্রতি অসীম দরদ ও গভীর ভালোবাসা না থাকলে সৃষ্টির প্রকাশ এত স্বচ্ছ ও স্বতঃস্ফূর্ত হয় না। নজরুলের সৃষ্টির মূলেই আছে সুনিপুণ মানবিক বোধ—মানবতা। তাই মহামানবতার মহামন্ত্রধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিকর্মের পরতে পরতে।
Humanity is a virtue linked with altruistic ethics derived from the human condition. It signifies human love and compassion towards each other. মানুষের যত গুণ আছে, তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানবতা। এজন্য বলা হয়, Humanity is the solid foundation of all virtues. মানবিক নজরুল সে মহত্তর গুণে সবার ওপরে মানুষকে স্থান দিয়েছেন। এজন্য অকুণ্ঠ চিত্তে তিনি ঘোষণা করেছেন—
“গাহি সাম্যের গান,
মানুষের চেয়ে বড়ো কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সবদেশে সবকালে ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
মানুষকে তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রে প্রতিস্থাপন করে প্রেম ও সৌন্দর্যের সৌধ বিনির্মাণে তিনি মেতে উঠেছেন সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
ব্রিটিশ প্রণীত ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতি সমাজদেহে যে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়েছিল, সে রাজরোগ শনাক্ত করে তার বিরুদ্ধে বরাবর উচ্চকণ্ঠ থেকেছেন কবি। জাতির ক্রান্তিলগ্নে বৃহত্তর ঐক্যের প্রত্যাশায় হিন্দু-মুসলিম মিলিত শক্তির জাগরণ কামনা করে বিভাজনকারীদের উদ্দেশে বলেছেন—
“হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী বল, মানুষ ডুবিছে, সন্তান মোর মার।”
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত কাঁপিয়ে দিতে, পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীনতার বর্ণিল আনন্দে মেতে উঠতে তিনি সাম্প্রদায়িক বিভেদ ভুলে সম্মিলিত শক্তির উদ্বোধন কামনা করেন।
“মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান।
মুসলিম তার নয়নমণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।”
তাঁর গীতল ধারায় মিলনের এ সুর তাই বড় আশা-জাগানিয়া। সুস্থির সমাজ গঠনে পারস্পরিক সহাবস্থানের জরুরতকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন বলেই জাত-পাত বা ধর্মের নামে ভণ্ডামিকে কষাঘাত করেছেন। আভিজাত্য, কৌলিন্য ও বনেদিয়ানার অন্তঃসারশূন্যতাকেও করেছেন চপেটাঘাত।
“জাতের নামে বজ্জাতি সব, জাত-জালিয়াত খেলছে জুয়া।
ছুলেই তোর জাত যাবে? জাত ছেলের হাতের নয় তো মোয়া।
হুকার জল আর ভাতের হাঁড়ি, ভাবলি এতেই জাতের জান,
তাই তো বেকুব, করলি তোরা এক জাতিকে একশো খান।”
মানুষে মানুষে বিভাজনের দেয়াল তুলে ফায়দা হাসিলের ব্যবসায়ীদের প্রতি তাঁর রোষ ঝরেছে নানান মাত্রায়। ১৯৪১ সালের একটি অভিভাষণে তিনি বলেছেন—
“কেউ বলে আমার বাণী যবন, কেউ বলে কাফের। আমি বলি, ও দু’টোর কোনোটাই না। আমি কেবলমাত্র হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় ধরে এনে হ্যান্ডশেক করাবার চেষ্টা করেছি; গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। সে হাত মেলানো যদি হাতাহাতির চেয়ে অশোভনীয় হয়ে থাকে, তাহলে ওরা আপনি আলাদা হয়ে যাবে। আমার গাঁটছড়ার বাঁধন কাটতে ওদের কোনো বেগ পেতে হবে না। কেননা, একজনের হাতে আছে লাঠি, আরেকজনের আস্তিনে আছে ছুরি। হিন্দু-মুসলমানে দিনরাত হানাহানি, জাতিতে জাতিতে বিদ্বেষ, যুদ্ধ-বিগ্রহ। মানুষের জীবনে একদিকে কঠিন দারিদ্র্য, ঋণ ও অভাব; অন্যদিকে লোভী অসুরের যক্ষের ব্যাংকে কোটি কোটি টাকা পাষাণস্তূপের মতো জমা হয়ে আছে। এই অসাম্য, ভেদজ্ঞান দূর করতে আমি এসেছিলাম। আমার কাব্যে, সংগীতে ও কর্মজীবনে অভেদ ও সুন্দর সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। আমি যশ চাই না, খ্যাতি চাই না, প্রতিষ্ঠা চাই না, নেতৃত্ব চাই না। জীবন আমার যত দুঃখময়ই হোক, বেদনার গান, আনন্দের গান গেয়ে যাব আমি। দিয়ে যাব নিজেকে নিঃশেষ করে সকলের মাঝে বিলিয়ে। সকলের বাঁচার মাঝে থাকব আমি বেঁচে। এই আমার ব্রত, এই আমার সাধনা, এই আমার তপস্যা।”
সুন্দরের সাধনা ও মিলন প্রচেষ্টার এমন দৃষ্টান্ত তাঁর সাহিত্যে বিরল নয় মোটেও।
মনুষ্যসভ্যতায় মানুষকে পরম মমতায় ভালোবেসে সবার ওপরে স্থান দিয়েছেন বলেই ধর্মের নামে মানুষ হত্যাসহ সমস্ত নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকেছেন তিনি। মানুষের মনে আঘাত দিলে সে আঘাত লাগে কাবার গায়ে। তাই তো তিনি উচ্চারণ করেন কাব্যিক সুষমায়—
“শুন হে মানুষ ভাই,
এ হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।”
কারণ তিনি মনে করেন, মানুষের জন্যই ধর্ম; ধর্মের জন্য মানুষ নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর কবিতার চরণে—
“পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল! মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।”
পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচন করে জাতির জীবনে স্বাধীনতা আনতে নজরুল সাহিত্যের সক্রিয়তা প্রশ্নাতীত। এই সক্রিয়তাই তাঁকে বিদ্রোহের পথে রসদ জুগিয়েছে। নজরুলের গান, কবিতা ও প্রবন্ধে সে বিপ্লবাত্মক সুর ব্যঞ্জিত হয়েছে দ্রোহের ভাষায়। কিছু আলোকিত চরণে তারই প্রতিফলন লক্ষণীয়—
“এই শিকল-পরা ছল মোদের, এ শিকল পরার ছল।
এই শিকল পরে শিকল তোদের করব যে বিকল।”
“দুর্গম গিরি, কান্তার-মরু, দুস্তর পারাবার হে,
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে, যাত্রীরা হুঁশিয়ার!”
“চল্ চল্ চল্,
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণীতল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল,
চল রে চল রে চল।”
“কারার ঐ লৌহকপাট,
ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট,
রক্তজমাট শিকল-পূজার পাষাণবেদী।”
একদিকে ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ কবিকে করেছে ক্ষুব্ধ; তিনি প্রতিবাদে মুখর হয়েছেন স্পর্ধিত চেতনায়। অন্যদিকে এদেশীয় লুম্পেন ও লুণ্ঠক ধনিক শ্রেণির অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধেও হয়েছেন খড়গহস্ত। এরই প্রকাশ এ ছত্রে—
“আনো তোমার হাতুড়ি,
ভাঙো অত্যাচারীর প্রমোদ ভবন।
ধূলায় লুটাও অর্থপিশাচ বলদর্পীর শির।”
এভাবে সামাজিক বৈষম্যের মূলে তিনি নির্মমভাবে কুঠারাঘাত করেছেন। ‘মানুষ’ কবিতায় মসজিদের মোল্লা আর মন্দিরের পুরোহিতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভেকধারী ধর্মাচারীর হৃদয়হীনতা ও অন্তঃসারশূন্যতাকে ক্রুশবিদ্ধ করেছেন।
নারী-পুরুষের জৈবিক ভিন্নতা পরস্পরের সহায়ক। এটি তাদের শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের শর্ত বা পরিমাপক নয়। সৃষ্টির ধারাবাহিকতায় একে অন্যের পরিপূরক। সেই অর্থে উৎকৃষ্ট, নিকৃষ্ট, কর্তৃত্ব বা অধীনস্থ—এসব শব্দ সমাজস্বাস্থ্যের জন্য সুখকর নয়। নারী-পুরুষ প্রতিপক্ষ না হয়ে পরস্পরের সহযোগী হলেই সভ্যতার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। সে কথাই কবি ব্যক্ত করেন অনুপম মহিমায়—
“সাম্যের গান গাই,
আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।
বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
লৈঙ্গিক বৈষম্য নিরসন করে কবি চান ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে। তারই প্রতিধ্বনি উল্লিখিত ‘নারী’ কবিতার প্রতি ছত্রে।
“গাহি সাম্যের গান,
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-খ্রিস্টান।”
‘সাম্যবাদী’ কবিতায় প্রস্ফুটিত অসাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির এ সুর নজরুল সাহিত্যে আকস্মিক নয়; তাঁর সাহিত্যাদর্শের একটি বড় জায়গাজুড়ে, তাঁর মনোভূমিতে এ সুরের ক্রমপ্রসার দুর্লক্ষ নয়। এই বিভেদ সমাজদেহের রুগ্ণতার লক্ষণ। এটি ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকাঠামো দ্বারা আরোপিত ও সৃষ্ট এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট হওয়ায় কবি এর থেকে মুক্তির প্রত্যয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদের ঊর্ধ্বে মানবতার উদ্বোধন কামনা করেছেন।
“হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান,
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রিস্টের সম্মান।”
দারিদ্র্যকে বন্দিত করলেও স্বাগত জানাননি কবি। কারণ অভাব, ক্ষুধা ও পীড়নে জর্জর মনুষ্যত্বের অবমাননায় তিনি শিউরে উঠেছেন। ব্যক্তিজীবনের আর্থিক অস্বাচ্ছল্য আর সামাজিক অনটনে পর্যুদস্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি দেখে এর পেছনের কারণ বুঝতে তাঁর দেরি হয়নি। উপরিতলের সমস্যাকে জিইয়ে রাখা হয় আর্থিক বৈষম্য টিকিয়ে রেখে দারিদ্র্যকে প্রলম্বিত করতে। আর্থিক বৈষম্য যে সমস্যার কেন্দ্রে, তা চিহ্নিত করে তিনি ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের ‘ফরিয়াদ’ কবিতায় যথার্থই বলেন—
“জনগণে যারা জোঁকসম শোষে, তারে মহাজন কয়,
সন্তানসম পালে যারা জমি, তারা জমিদার নয়।
মাটিতে যাদের ঠেকে না চরণ,
মাটির মালিক তাহারাই হন—
যে যত ভণ্ড ধড়িবাজ আজ, সে তত বলবান।”
কৃষক, শ্রমিক, মুটে, মজুর, জেলে, মাঝিসহ নিম্নবিত্তের পেশাজীবী মানুষ এবং সামাজিক নিপীড়নে জর্জর প্রান্তিক গণমানুষের সমন্বিত স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় নজরুলের ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’ ও ‘ভাঙার গান’ কাব্যের বিভিন্ন কবিতা, গান ও প্রবন্ধে। সাহিত্যচর্চা তাই তাঁর কাছে নিছক বিলাসিতা হয়ে থাকেনি; হয়ে উঠেছে মানবমুক্তি ও সমাজপরিবর্তনের অনিবার্য হাতিয়ার এবং আশ্রয়।
মানবতা তাঁর মোক্ষ, মানবকল্যাণ বা মানবমুক্তি তাঁর পাথেয় হলেও কোনো নির্দিষ্ট দার্শনিক তত্ত্ব বা মতাদর্শের আলোকে তিনি ব্রিটিশবিরোধিতা কিংবা সাম্যসমাজ নির্মাণে ব্রতী হননি। গান্ধীর অহিংস নীতি যেমন তাঁকে আকৃষ্ট করেছে, তেমনি বা তার চেয়েও বেশি সুভাষ বসুর সশস্ত্র আজাদির পথ তাঁকে প্রভাবিত করেছে। চিত্তরঞ্জন দাশের প্রতি নিবেদিত হয়েছে সশ্রদ্ধ প্রণতি। ব্রিটিশ বিতাড়নে হিন্দু-মুসলিম মিথ ও ঐতিহ্যকে নির্দ্বিধায় করেছেন প্রতীকাশ্রয়ী। অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন করে সামাজিক সাম্য কায়েমে কখনো কখনো মার্ক্সীয় প্রভাবকে তিনি এড়াতে পারেননি, যদিও মার্ক্সীয় তত্ত্ব বা দর্শনে তিনি স্থিত ছিলেন না।
ব্যক্তিমানুষ বহুধা সত্তায় বিভাজিত। কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের মোড়কে তাকে মাপা বা ধরা বেশ দুরূহ। আর নজরুলের মতো মানুষের পক্ষে কোনো কংক্রিট মতাদর্শে স্থিত হওয়া সমকালীন সামাজিক ঘূর্ণাবর্তে আরও কঠিন ছিল। তাই নানামাত্রিক প্রপঞ্চ তাঁর সৃষ্টিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। তাঁর কলমে আল্লাহ, রাসুল, বৈষ্ণব, শ্যামা, রবীন্দ্রনাথ, গান্ধী, সুভাষ, চিত্তরঞ্জন, মার্ক্স, লেনিন, কামাল আতাতুর্ক, কালাপাহাড়, পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্র একাকার হয়েছে। আর এসবই করেছেন তিনি মানুষের মঙ্গলার্থে, কল্যাণার্থে। এজন্য তাঁর সৃষ্টিকর্মে মানবিক আকাঙ্ক্ষা এত জীবন-সংবেদী।
জরাজীর্ণ, অন্ধকারাচ্ছন্ন, বদ্ধ অচলায়তনের অর্গল ভেঙে মুক্ত মানুষের আলোকাভিসারের প্রত্যয়ে তিনি সুন্দরের আগমন প্রত্যাশা করেছেন। ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, ‘আমার পথ’, ‘যৌবনের গান’সহ নজরুলের বহু প্রবন্ধের মূল সুর ধ্বনিত হয়েছে সুন্দরের কামনায়। কীটসের ভাষায়—Truth is beauty, beauty is truth; সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য। সত্য-সুন্দরের এই পথই মানবমুক্তির পথ, কল্যাণের পথ। সকল সংকীর্ণ চিন্তা ও স্বার্থবুদ্ধির ঊর্ধ্বের এই পথই মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ। তাই সত্য ও সুন্দর আদিগন্ত ডানা মেলে নজরুল সাহিত্যকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য—মানবতার মহিমায় যে স্বাতন্ত্র্য আজও প্রোজ্জ্বল।