কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন শুধু আলো ছড়ানোর জন্য। তারা যখন নীরবে চলে যান, তখন চারপাশের চেনা জগৎটায় কেমন যেন এক ফালি অন্ধকার নেমে আসে। তেমনি এক আলোর ফেরিওয়ালা, বিশিষ্ট লেখক ও ভাষাসৈনিক মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। ঢাকার নিজ বাসভবনে যখন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। জীবনের এক দীর্ঘ নদী পার হয়ে তিনি এখন অন্য এক ভুবনের বাসিন্দা।
সময়টা ছিল ১৯৩১ সালের ১লা জানুয়ারি। টাঙ্গাইল জেলার ভূঞাপুর উপজেলার ফসল আন্দি গ্রামের এক ঐতিহ্যবাহী ডাক্তার পরিবারে কেঁদে উঠেছিল একটি শিশু। কে জানত, সেই ব্যবস্থার মাঝে বড় হওয়া ছেলেটি একদিন এই দেশের ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম জড়িয়ে নেবেন? তাঁর পৈতৃক পরিবারটি শিক্ষা আর পেশাগত ঐতিহ্যের জন্য আগে থেকেই সমাদৃত ছিল।
১৯৪৮ সালে তিনি পড়তে আসেন ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে। তরুণ মুস্তাফিজুর রহমানের রক্তে তখন দেশের জন্য, নিজের ভাষার জন্য এক তীব্র আকুতি। সেই আকুতির প্রকাশ ঘটল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে। মায়ের মুখের ভাষার অধিকার আদায়ের সেই ঐতিহাসিক ও উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বুকের ভেতরের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে তিনি সেদিন রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন।
মুস্তাফিজুর রহমান শুধু ভাষা আন্দোলনেই থেমে থাকেননি। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, আমাদের এই প্রিয় বাংলা ভাষা একদিন বিশ্বমঞ্চে তার যোগ্য আসনটি বুঝে নেবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলা ভাষার ব্যবহার প্রসারে তিনি এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে, জাতিসংঘে দাপ্তরিক কাজে বাংলা তারিখ ব্যবহারের এক অনন্য প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন তিনি। নিজের এই স্বপ্নের কথা, এই দাবির কথা তিনি লিখে গেছেন তাঁর “INCLUSION OF BANGLA DATE UN OFFICE” বইটিতে। তাঁর সেই প্রস্তাব আর গভীর লেখালেখি আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলা সন-তারিখ ব্যবহারের ধারণাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বাংলা, ৭ই জুন ২০২৪ শুক্রবার সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে তিনি এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটান। ৯৩ বছরের এক বর্ণাঢ্য, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অথচ সুন্দর জীবনের অবসান ঘটল এক নিমেষে।
“মানুষ মারা গেলে সব শেষ হয়ে যায় না। যারা নিজের ভাষার জন্য বুক পেতে দেয়, তারা ভাষার অক্ষরের ভেতর দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে অনন্তকাল।” মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু ১৯৫২-এর রাজপথ থেকে শুরু করে জাতিসংঘের দাপ্তরিক কাগজে বাংলার অধিকার আদায়ের যে স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন, তা এ দেশের মানুষ কখনো ভুলবে না। বাংলা ভাষা আন্দোলন ও ভাষা গবেষণায় তাঁর এই অবদান চিরকাল এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো আমাদের পথ দেখাবে। আমরা তাঁর আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।