সৃজনশীল অর্থনীতিতে বড় সম্ভাবনা, তবে প্রয়োজন আরও বড় বিনিয়োগ

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

অর্থনীতি মানেই শুধু শিল্প, বাণিজ্য বা পুঁজিবাজার নয়। বিশ্বজুড়ে এখন দ্রুত বিকশিত হচ্ছে একটি নতুন খাত—সৃজনশীল অর্থনীতি। চলচ্চিত্র, সংগীত, সাহিত্য, ডিজিটাল কনটেন্ট, গেমিং, ডিজাইন, সফটওয়্যার এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনীতি ইতোমধ্যে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারও প্রথমবারের মতো সৃজনশীল অর্থনীতিকে উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার রূপরেখা উপস্থাপন করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও বাস্তব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও বড় পরিসরের বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।

অর্থ বিভাগের উপস্থাপনায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)-এর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী সৃজনশীল অর্থনীতি থেকে বছরে ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় হয় এবং এ খাতে প্রায় ৫ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বে সৃজনশীল সেবা রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা পাঁচ বছর আগের তুলনায় ২৭ শতাংশ বেশি। এ রপ্তানির মধ্যে সফটওয়্যার সেবার অবদান ছিল ৪১ শতাংশ। একই বছরে সৃজনশীল পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭১৩ বিলিয়ন ডলার।

জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদানের দিক থেকেও অনেক দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় এ খাতের অবদান ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ, ফিলিপাইনে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রে ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভারতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান উল্লেখ করা হয়নি, সরকার ভবিষ্যতে দেশের জিডিপিতে সৃজনশীল অর্থনীতির অবদান ১ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশে লক্ষাধিক তরুণ ইতোমধ্যে ইউটিউব, ডিজিটাল মিডিয়া, গ্রাফিক ডিজাইন, সফটওয়্যার, সংগীত, চলচ্চিত্র এবং অনলাইন কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত। সঠিক প্রশিক্ষণ, অর্থায়ন ও বাজারসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক, উদ্যোক্তা ও গণমাধ্যমে কর্মরতরা মনে করেন, সরকারের বর্তমান উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাস্তব চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ এখনও অনেক কম। তাঁর মতে, দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং সৃজনশীল শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী তহবিল গঠন প্রয়োজন।

চলচ্চিত্র, সংগীত, সাহিত্য, ডিজিটাল কনটেন্ট, গেমিং ও ডিজাইন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এগুলো শুধু সংস্কৃতির বিকাশই ঘটাবে না, একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগও তৈরি করবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সৃজনশীলতার বিকাশ একে অপরের পরিপূরক।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে সৃজনশীল অর্থনীতি শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করে না, বরং তা জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তিতেও পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্যও এটি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং রপ্তানি আয়ের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

এ কারণে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের সৃজনশীল অর্থনীতি আগামী দশকে দেশের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় রচনা করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *