প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিজিটাল নজরদারি, ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা: অর্থমন্ত্রী

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বড় ধরনের ডিজিটাল সংস্কার ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থার ঘোষণা দিয়েছেন পরিকল্পনা ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, এখন থেকে সরকারি প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং গাফিলতি বা ব্যর্থতার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী জানান, সব মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং কোথায় বিলম্ব বা সমস্যা হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে।

তিনি বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রধান সমস্যা অর্থের অভাব নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি। “বরাদ্দ কোনো সমস্যা নয়। আমাদের সমস্যা হলো আমরা কত দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে পারি,” বলেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী জানান, ভবিষ্যতে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এগুলো হলো—ব্যয়-সাশ্রয়ী, বিনিয়োগের রিটার্ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশগত প্রভাব।

তিনি বলেন, এই মানদণ্ড পূরণ করতে না পারলে কোনো প্রকল্প অনুমোদন পাবে না।

সরকার বর্তমানে আগের প্রশাসন থেকে পাওয়া প্রায় এক হাজার ৩০০টি প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করছে বলেও জানান তিনি। যেসব প্রকল্প অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে, সেগুলো বাতিল করা হবে। আর যেসব প্রকল্পে ইতোমধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেগুলোর উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে নতুনভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

দেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, অনেক ব্যাংক বর্তমানে মূলধন সংকটে রয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রার অবমূল্যায়নসহ বিভিন্ন কারণে বেসরকারি খাতও চাপের মুখে রয়েছে।

তিনি জানান, ব্যাংক পুনঃমূলধনীকরণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন (আইএফসি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান চেজও আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

মন্ত্রী বলেন, আমানতকারীরা যখন নিশ্চিত হবেন যে প্রয়োজন হলে সহজেই তাদের টাকা তুলতে পারবেন, তখনই ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরে আসবে।

পুঁজিবাজার সংস্কারের অংশ হিসেবে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যোগ্যতার ভিত্তিতে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন পুনর্গঠনের কথাও জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান হ্রাস, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জের মধ্যেই এবারের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

তার মতে, অর্থনীতিকে আবার সচল করতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি এই কৌশলকে টিউবওয়েল চালুর আগে পানি ওঠানোর জন্য প্রাথমিকভাবে পানি ঢালার সঙ্গে তুলনা করেন।

মন্ত্রী জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নআয়ের মানুষের সহায়তায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় আগামী অর্থবছরে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার করতে কৃষকদের জন্য ‘ফার্মার্স কার্ড’ বিতরণ কার্যক্রমও শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্বলতার কথা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য নিজেদের পকেট থেকে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন, তা অনেক নিম্ন আয়ের দেশের তুলনাতেও বেশি।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় পরিসরে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এছাড়া সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যের মান বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রবেশে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিশেষ করে অ্যামাজন ও ইবের মতো বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের প্রবেশ সহজ করতে কাজ করবে সরকার।

ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী।

তিনি বলেন, একটি ‘সিঙ্গেল-পয়েন্ট অনুমোদন ব্যবস্থা’ চালু করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দফতর অনুমোদন না দিলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমোদিত বলে গণ্য হবে।

তার মতে, এই উদ্যোগ ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমাবে, বিনিয়োগ বাড়াবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *