আফ্রিকায় মার্কিন ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কেনো সংকুচিত হচ্ছে

আফ্রিকা মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে ভিসা প্রক্রিয়াকরণ করা প্রায় ৫০টি দূতাবাস ও কনস্যুলেটের পরিবর্তে মাত্র ২০টি আঞ্চলিক ‘হাব’ থেকে এই সেবা পরিচালিত হবে।

মার্কিন সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেট ডিপার্টমেন্টের অভ্যন্তরীণ নথি এবং কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তার তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে। জুন মাসের মধ্যেই এটি কার্যকর হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নতুন ব্যবস্থায় আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ২০টি শহরকে ভিসা প্রক্রিয়াকরণের কেন্দ্র হিসেবে রাখা হবে। এর মধ্যে রয়েছে আবিজান, আক্রা, আদ্দিস আবাবা, কেপ টাউন, ডাকার, দার-এস-সালাম, জিবুতি, জোহানেসবার্গ, কাম্পালা, কিগালি, কিনশাসা, লাগোস, লোমে, লুয়ান্ডা, মালাবো, মনরোভিয়া, নাইরোবি, পোর্ট লুই, প্রাইয়া এবং ইয়াউন্দে।

এসব কেন্দ্র থেকে অভিবাসী ও অ-অভিবাসী উভয় ধরনের ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। প্রশাসনের দাবি, অনেক বিদেশি নাগরিক অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করে নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করেন। নতুন ব্যবস্থা এই প্রবণতা কমাতে সহায়তা করবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রীভূত ভিসা ব্যবস্থা নিরাপত্তা যাচাই আরও কঠোর করবে এবং সীমিত জনবলকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিদেশে পরিচালিত কার্যক্রম নিয়মিত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। লক্ষ্য হলো করদাতাদের অর্থ আরও দক্ষভাবে ব্যবহার করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে কার্যক্রমকে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কঠোর নিরাপত্তা যাচাই এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করাই এই পুনর্গঠনের অন্যতম উদ্দেশ্য।

সম্প্রতি দক্ষিণ সুদান, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআর কঙ্গো) এবং উগান্ডায় ইবোলার প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় ১৮ই  মে ২০২৬ থেকে ওই তিন দেশের মার্কিন দূতাবাসে ভিসা সেবা স্থগিত করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিবেচনাও নতুন পরিকল্পনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে সেইসব দেশের নাগরিকদের ওপর, যেখানে কোনো ভিসা হাব থাকবে না।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় মালির একজন শিক্ষার্থীকে। তাকে ভিসা সাক্ষাৎকারের জন্য ঘানার আক্রা অথবা সেনেগালের ডাকার যেতে হতে পারে। এতে অতিরিক্ত বিমান ভাড়া, আবাসন ব্যয় এবং সময়ের প্রয়োজন হবে।

ফলে উচ্চশিক্ষা, ব্যবসায়িক সফর, পর্যটন এবং পারিবারিক ভ্রমণ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার আফ্রিকান শিক্ষার্থী আবেদন করেন। একইভাবে ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরাও নিয়মিত ভিসা সেবার ওপর নির্ভরশীল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাক্ষাৎকারের জন্য অন্য দেশে যেতে হলে অনেক আবেদনকারী নিরুৎসাহিত হতে পারেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্যবসায়িক খাতও প্রভাবিত হতে পারে।

মার্কিন প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, যেসব দূতাবাস ও কনস্যুলেট হাব হিসেবে থাকবে না, সেগুলো বন্ধ করা হচ্ছে না।

এসব মিশন মার্কিন নাগরিকদের পাসপোর্ট নবায়ন, জরুরি কনস্যুলার সেবা, কূটনৈতিক ভিসা এবং বিশেষ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। তবে সাধারণ ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণ সীমিত করা হবে।

এই সিদ্ধান্তকে শুধু প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশ্লেষক। তাদের মতে, এটি আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক উপস্থিতি ও প্রভাবের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সময়ে চীন ও রাশিয়া আফ্রিকায় তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সেবা সীমিত হওয়া আফ্রিকার কিছু দেশের কাছে নেতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভিসা প্রক্রিয়া জটিল হলে শিক্ষা, ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, পরিবার পুনর্মিলন বিলম্বিত হবে, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ কঠিন হবে এবং অনেক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে অন্য দেশে পড়াশোনার সুযোগ খুঁজবেন।

মার্কিন প্রশাসন বলছে, এই পদক্ষেপ সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং ভিসা ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে। তবে সমালোচকদের মতে, এর ফলে আফ্রিকার কোটি মানুষের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পথ আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পর এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। তবে ইতোমধ্যে স্পষ্ট যে, আফ্রিকায় মার্কিন ভিসা নীতির এই পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি কূটনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং মানবিক সম্পর্কের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *