ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ লিও চতুর্দশ তার প্রথম এনসাইক্লিক্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিপদকে বাইবেলের কিংবদন্তি ‘বাবেলের টাওয়ার’-এর সঙ্গে তুলনা করে বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করেছেন। ২৫শে মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই ঐতিহাসিক নথিতে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, AI “একটি বিরোধী-মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে স্বাভাবিক করার হুমকি দিচ্ছে” এবং এর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
পোপ তার এনসাইক্লিক্যাল ম্যাগনিফিকা হিউমানিটাস: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানব ব্যক্তিত্বের সুরক্ষা (ম্যাগনিফিকা হিউমানিটাস: অন সেফগার্ডিং দ্য হিউম্যান পারসন ইন দ্য টাইম অফ আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স)-এ দুটি বাইবেলীয় চিত্র তুলে ধরেছেন—বাবেলের টাওয়ার এবং নেহেমিয়ার নেতৃত্বে জেরুজালেম পুনর্নির্মাণ। তিনি বলেন, মানবতা আজ একটি মোড়কে দাঁড়িয়ে: “হয় একটি নতুন বাবেলের টাওয়ার নির্মাণ, নয় এমন একটি শহর গড়ে তোলা যেখানে ঈশ্বর ও মানবতা একসঙ্গে বসবাস করবে।”
বাবেলের গল্পে, মানুষ এক ভাষা, এক প্রযুক্তি এবং এক দিকনির্দেশনায় আকাশছোঁয়া টাওয়ার তৈরির চেষ্টা করেছিল—কিন্তু তা ছিল অহংকার ও ঈশ্বরহীন আত্ম-প্রতিষ্ঠার প্রকল্প। এর ফলাফল ছিল ভাষার বিভ্রান্তি ও ছড়িয়ে পড়া। পোপ বলেন, AI-এর অবাধ বিস্তার ঠিক সেই “বাবেল সিন্ড্রোম” তৈরি করছে—যেখানে লাভের মূর্তিপূজা, বৈচিত্র্যের বিলোপ এবং মানুষকে শুধু তথ্য ও কর্মদক্ষতায় রূপান্তরিত করার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে।
পোপ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে প্রযুক্তি নিজে থেকে মন্দ নয়, তবে “প্রযুক্তি কখনোই নিরপেক্ষ নয়, কারণ এটি যারা একে উদ্ভাবন, অর্থায়ন, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করে তাদের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।” তিনি AI-এর সম্ভাবনাকে অস্বীকার না করে এর ঝুঁকির দিকে আলোকপাত করেছেন—বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত অস্ত্র, তথ্য বিকৃতি, এবং মানব সম্পর্কের কৃত্রিম অনুকরণের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক যোগাযোগ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা।
এনসাইক্লিক্যালে পোপ AI-চালিত অস্ত্র ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি মন্তব্য করেন, “কোনো অ্যালগরিদম যুদ্ধকে নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে পারে না।” AI যুদ্ধকে আরও দ্রুত, আরও নিষ্ঠুর এবং আরও নৈর্ব্যক্তিক করে তুলছে—যেখানে শত্রু পরিণত হচ্ছে পরিসংখ্যানে এবং নিরীহ মানুষ ‘পার্শ্ব ক্ষতি’তে।
এছাড়া, পোপ ডিজিটাল অর্থনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা নতুন দাসত্বের চেইনের কথা তুলে ধরেছেন—যেখানে ডেটা লেবেলিং, কন্টেন্ট মডারেশনের মতো কাজে লাখো মানুষ, বিশেষ করে নারী ও তরুণরা, ন্যূনতম মজুরিতে কঠোর পরিশ্রম করছেন। এমনকি দুর্লভ মাটির খনিজ (রেয়ার আর্থ) উত্তোলনে শিশুশ্রমিকদের ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
পোপ লিও চতুর্দশ—যিনি শিকাগোর সন্তান এবং ক্যাথলিক চার্চের ২৬৭তম পোপ—তার পদবি নির্বাচনের কারণ হিসেবেই প্রযুক্তি বিপ্লবকে উল্লেখ করেছিলেন। তার নামকরণের আদর্শ লিও ত্রয়োদশ শিল্প বিপ্লবের যুগে কারখানা শ্রমিকদের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন; এখন লিও চতুর্দশ ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একই ঐতিহ্য ধারণ করছেন।
তার এই এনসাইক্লিক্যাল প্রকাশিত হয়েছে লিও ত্রয়োদশের ঐতিহাসিক রেরুম নোভারাম (Rerum Novarum) এর ১৩৫তম বার্ষিকীতে—যা সামাজিক শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।
পোপ শেষে আশার কথা বলেছেন। তিনি নেহেমিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—যিনি ধ্বংসস্তূপের মাঝে প্রার্থনা, পরিকল্পনা ও সহনশীল পরিশ্রমের মাধ্যমে জেরুজালেম পুনর্গঠন করেছিলেন। পোপের আহ্বান, “আমাদের ভয় পাওয়ার দরকার নেই—আমাদের সময়ের নির্মাণস্থলে হাত ময়লা করতে ভয় পাওয়া উচিত নয়।” তিনি সবাইকে বাবেলের টাওয়ার নির্মাণ ত্যাগ করে সর্বজনীন মঙ্গলের জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে “মানব হৃদয়কে সেই স্থান হিসেবে বিশ্ব আবার চিনতে পারে যেখানে ঈশ্বর বাস করতে চান।”