ক্যান্সার—এই এক শব্দেই বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আতঙ্কের সঞ্চার হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান প্রায় এক কোটি মানুষ। এই ভয়ঙ্কর রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ওষুধই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। কিন্তু বিদ্যমান ক্যান্সার ওষুধগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং প্রতিরোধক্ষমতার কারণে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর নতুন ওষুধের সন্ধানে রয়েছেন।
এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, ইরানের একদল গবেষক তাদের অভিনব গবেষণার মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। ইরানের জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সম্পন্ন হয়েছে একটি বিপ্লবী গবেষণা প্রকল্প। এই প্রকল্পের শিরোনাম: “দ্বি-কেন্দ্রিক অর্গানোপ্ল্যাটিন ও টিন কমপ্লেক্সের ডিজাইন: সংশ্লেষণ, শনাক্তকরণ এবং ক্রিস্টালোগ্রাফিক গঠন”।
এই গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. বদরি জামান মোমেনি—তেহরানের প্রখ্যাত খাজে নাসিরউদ্দিন তুসি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদ সদস্য। ড. মোমেনি শিরাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অজৈব রসায়নে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার নেতৃত্বে এই গবেষণা প্রকল্পটি ইরানের জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন -এর আর্থিক সহায়তায় সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় প্ল্যাটিন-ভিত্তিক ওষুধের ইতিহাস প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি পুরনো। সিসপ্ল্যাটিন এবং অক্সালিপ্লাটিন—এই দুটি ওষুধ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে এই ওষুধগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো তাদের তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ক্যান্সার কোষের প্রতি প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠা।
ড. মোমেনি তার গবেষণায় ব্যাখ্যা করেছেন: “প্ল্যাটিন-ভিত্তিক পরিচিত ওষুধগুলো সাধারণত বিভিন্ন ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যদিও এগুলো কার্যকর, তবে তাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং ব্যবহারের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলোর প্রয়োগ সীমিত। বিশ্বজুড়ে প্ল্যাটিন-ভিত্তিক নতুন প্রজন্মের ক্যান্সার ওষুধ ডিজাইনের গবেষণা চলমান রয়েছে।”
ড. মোমেনি এবং তার দল যে অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা দুটি শক্তিশালী ধাতব উপাদান—প্ল্যাটিনাম এবং টিন-কে একত্রিত করে একটি নতুন ধরনের কমপ্লেক্স যৌগ তৈরি করেছেন।
প্ল্যাটিনাম : দশকের পর দশক ধরে ক্যান্সার চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা প্রমাণিত। এটি ক্যান্সার কোষের ডিএনএ-র সাথে যুক্ত হয়ে কোষের বংশবৃদ্ধি বন্ধ করে দেয়।
টিন : সম্প্রতি টিন-ভিত্তিক যৌগগুলোর ক্যান্সারবিরোধী বৈশিষ্ট্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়াও টিন ক্যাটালিস্ট, ন্যানোপদার্থ এবং অতিমলিকুলার রসায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ড. মোমেনি জানান: “সম্প্রতি প্ল্যাটিনাম-টিন দ্বি-ধাতব যৌগগুলো ব্যাপক গুরুত্ব অর্জন করেছে, কারণ এগুলো ক্যাটালিস্ট, ন্যানোপদার্থ, ক্যান্সারবিরোধী যৌগ ডিজাইন, ক্লাস্টার এবং অতিমলিকুলার রসায়নে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।”
এই গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—প্রথমবারের মতো প্ল্যাটিন(II) কমপ্লেক্সের অক্সিডেশন-অ্যাডিশন বিক্রিয়া নতুন অর্গানোটিন(IV) যৌগের সাথে সম্পাদন করা হয়েছে। ড. মোমেনি উল্লেখ করেছেন:
“এই গবেষণা প্রকল্পে, প্রথমবারের মতো আমরা প্ল্যাটিনের একটি নতুন সিরিজের যৌগ তৈরিতে সফল হয়েছি, যা অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমে তৈরি করা সম্ভব নয়। যেহেতু প্ল্যাটিন ও টিন—উভয় ধাতুই চিকিৎসায় উচ্চ ক্যান্সারবিরোধী বৈশিষ্ট্য রাখে, তাই আশা করা যায় যে এই যৌগগুলো উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা ধারণ করে।”
বিদ্যমান প্ল্যাটিন-ভিত্তিক ওষুধগুলোর মূল সমস্যা হলো তাদের বিষাক্ততা। সিসপ্ল্যাটিনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে কিডনির ক্ষতি, নিউরোপ্যাথি, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং বমি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় আণবিক এবং পলিমার-ভিত্তিক প্ল্যাটিন ওষুধ ডিজাইন করা হয়েছে, যেগুলো সিসপ্ল্যাটিনের তুলনায় কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলোর কার্যপ্রণালী প্রচলিত প্ল্যাটিন ওষুধের মতোই।
ড. মোমেনির দল যে দ্বি-কেন্দ্রিক কমপ্লেক্স ডিজাইন করেছেন, তা সম্ভবত একটি নতুন মেকানিজমের মাধ্যমে ক্যান্সার কোষকে আক্রমণ করতে পারে। বিশেষ করে টিনের উপস্থিতি প্ল্যাটিনের কার্যকারিতা বাড়াতে পারে এবং একই সাথে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এই গবেষণার ফলাফল কেবল একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার নয়, বরং ভবিষ্যতের ক্যান্সার ওষুধ ডিজাইনের একটি নতুন পথ প্রশস্ত করেছে। ড. মোমেনি আশাবাদী: “এই প্রকল্পের ফলাফল ভবিষ্যতে গবেষকদের এই গবেষণার ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে এবং নতুন প্রজন্মের ওষুধ ডিজাইন করতে উৎসাহিত করতে পারে।”
তবে গবেষক স্বীকার করেছেন যে, টিনের সহকারী ক্যাটালিস্ট হিসেবে ভূমিকা এখনও সম্পূর্ণরূপে অজানা। এই রহস্য উন্মোচন হলে, হয়তো আরও কার্যকর ও নিরাপদ ক্যান্সার ওষুধের সন্ধান পাওয়া যাবে।
এই গবেষণা ইরানের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দশকের পর দশক ধরে ইরান জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করে আসছে। ক্যান্সার গবেষণা তাদের অগ্রাধিকার খাতগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানি বিজ্ঞানীরা তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় বিশ্বমানের গবেষণা পরিচালনা করছেন। এই গবেষণা প্রকল্প সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ।
ক্যান্সারের মতো ভয়ঙ্কর রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রতিটি ছোট আবিষ্কার একদিন বিজয়ের দিকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়। ড. বদরি জামান মোমেনি এবং তার দলের এই গবেষণা সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
দ্বি-কেন্দ্রিক অর্গানোপ্ল্যাটিন-টিন কমপ্লেক্স—এই নামটি হয়তো একদিন ক্যান্সার রোগীদের জন্য নতুন আশার প্রতীক হয়ে উঠবে। যদিও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং বাজারজাতকরণের আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে, তবু এই গবেষণা প্রমাণ করে যে মানবজাতির সবচেয়ে প্রাচীন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চলছে, এবং বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই নতুন অস্ত্র উদ্ভাবন করছেন।
—
সূত্র: ইরানের জাতীয় সংবাদ সংস্থা (IRNA), মেহর নিউজ এজেন্সি, ইরানের জাতীয় বিজ্ঞান ফাউন্ডেশন।