বাংলাদেশ কি এক নিউরোটক্সিক সমাজে পরিণত হচ্ছে?

সাদমান ফাকিদ

ইউএসে আসার পর আমি আর আনিকা একটা বিষয় খুব স্পষ্টভাবে খেয়াল করলাম। আমাদের বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট কমিউনিটিতে অনেক নতুন বাবা-মা আছেন। প্রায় প্রতিটি কমিউনিটি ইভেন্টেই তাদের ছোট ছোট বাচ্চারা আসে। তারা সবার সঙ্গে মিশে, খেলাধুলা করে, আনন্দ করে। অদ্ভুতভাবে এই বাচ্চাগুলো বাংলাদেশের সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় অনেক বেশি হাসিখুশি ও স্থির মনে হয়।

বাংলাদেশে আমার ছোট বোন, কাজিনসহ অনেক শিশুকে বড় হতে দেখেছি। তুলনা করলে মনে হয়েছে, তারা বেশি খিটখিটে ছিল, বেশি কান্নাকাটি করত। অপরিচিত ভিড় বা নতুন পরিবেশে অস্বস্তি আরও বেশি দেখা যেত। সেখানে আমেরিকায় বড় হওয়া বাংলাদেশি বাচ্চাদের মধ্যে সহজে মিশে যাওয়ার প্রবণতা বেশি, আর কেঁদে উঠলেও দ্রুত শান্ত হয়ে যায়।

অবশ্যই এর বড় কৃতিত্ব তাদের বাবা-মায়ের। তারপরও এই পার্থক্যটা এতটাই চোখে পড়ার মতো যে বিষয়টি নিয়ে অনেকের সঙ্গে আলোচনা করেছি। প্রায় সবাই কমবেশি একমত হয়েছেন।

এই হুটহাট কান্নাকাটি আসলে কেবল আচরণগত বিষয় নয়; এর পেছনে জৈবিক প্রক্রিয়াও আছে। আমরা কাঁদি মস্তিষ্কের এক অংশ দিয়ে, আবার সেই কান্না থামাই অন্য অংশ দিয়ে। কান্না থামানোর যে ইনহিবিটরি মেকানিজম, তা মূলত প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে কাজ করে। এই অংশই আবেগের চাপের মধ্যে মস্তিষ্ককে শান্ত রাখে। অর্থাৎ বিষয়টি ইম্পালস কন্ট্রোলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

আর এই ইম্পালস কন্ট্রোলের সংকট কি শুধু শিশুদের? নাকি পুরো সমাজের?

বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর আমরা যেন এমন এক জাতিকে দেখছি, যার আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্রমশ ভেঙে পড়ছে।

এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তোফাজ্জলের কথা। মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষকে ছাত্ররা প্রথমে মারধর করে আধমরা করল। তারপর থামল। আবার ফিরে এসে আরও মারল। শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলল।

মনে পড়ে দীপু চন্দ্র দাসের কথা। মানুষ তাকে পিটিয়ে গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। আশপাশে দাঁড়িয়ে অনেকে উল্লাস করল। অথচ কারও মনে হলো না—এখানে থামা দরকার।

আবরার ফাহাদ থেকে লালচাঁদ সোহাগ—এমন বহু মানুষ একই ধরনের উন্মত্ত সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এমন সব যুবকদের হাতে, যারা নিজেদের থামাতে শেখেনি। মৃতদেহকেও আঘাত করতে থাকে তারা।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ—এই অল্প সময়েই মবের হাতে নিহত হয়েছেন অন্তত সাড়ে তিনশ মানুষ। রিপোর্টেড সংখ্যাই এত।

এই সহিংসতার ব্যাখ্যায় প্রচলিত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অবশ্যই কিছুটা সত্য। শেখ হাসিনার সরকারের পতন, দুর্বল অন্তর্বর্তী প্রশাসন, নতুন সরকারের অস্থিরতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো মানুষ মারার আকাঙ্ক্ষা, সেই উন্মত্ততার গতি বা তীব্রতাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না।

বাংলাদেশে এখন কোনো গুজব ছড়ালেই মুহূর্তে ভিড় জমে যায়। যেন আফ্রিকার জঙ্গলে দলছুট হরিণ দেখে ছুটে চলা শিকারি প্রাণী। কেউ মারছে, কেউ ভিডিও করছে, কেউ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই সহিংসতার দ্রুততা ও স্বাভাবিকীকরণ কি শুধু রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ধরা পড়ে?

আমার কাছে মনে হয় না।

তাই উত্তর খুঁজতে গিয়ে চোখ আটকে যায় আমেরিকার একটি গবেষণায়।

লেড, অপরাধ ও ২২ বছরের ব্যবধান

১৯৬০ ও ৭০-এর দশক ছিল আমেরিকায় সহিংস অপরাধের ভয়াবহ সময়। এরপর নব্বইয়ের দশকে হঠাৎ করেই সহিংস অপরাধের হার কমতে শুরু করে। অর্থনীতিবিদ, অপরাধবিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক—অনেকে বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। কেউ বলেন কঠোর পুলিশিং, কেউ বলেন ব্যাপক কারাবন্দি নীতি, কেউ বলেন বৈধ গর্ভপাতের প্রভাব। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যাই পুরো চিত্রের সঙ্গে পুরোপুরি মেলেনি।

এরপর একুশ শতকের শুরুতে অর্থনীতিবিদ রিক নেভিন একটি আলোচিত গবেষণা প্রকাশ করেন। তিনি দেখান, গ্যাসোলিনে সীসা বা লেড ব্যবহারের সময়ের সঙ্গে সহিংস অপরাধ বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে প্রায় ২২ বছরের ব্যবধানে।

অর্থাৎ, যখন গ্যাসোলিনে লেড ব্যবহার শুরু হয়, প্রায় ২২ বছর পর সহিংস অপরাধ বাড়ে। আবার লেড বন্ধ হওয়ার প্রায় ২২ বছর পর অপরাধ কমতে শুরু করে।

২২ বছর—একটি শিশুর বড় হয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সময়।

নেভিন এই গবেষণা আরও কয়েকটি দেশে সম্প্রসারণ করেন। প্রায় সব ক্ষেত্রেই একই ধরনের সম্পর্ক পাওয়া যায়। কোরিলেশন ছিল ০.৯-এরও বেশি—যা সামাজিক বিজ্ঞানে অত্যন্ত বিরল।

এর পেছনে স্নায়ুবিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও আছে।

লেড বা সীসা শরীরে ক্যালসিয়ামের মতো আচরণ করে। বিকাশমান মস্তিষ্কে এটি ক্যালসিয়ামের জায়গা দখল করে ফেলে এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই অংশই ইম্পালস কন্ট্রোল, ভবিষ্যৎ চিন্তা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

লেডে আক্রান্ত শিশুরা হয়তো তাৎক্ষণিক বড় কোনো লক্ষণ দেখাবে না। কিন্তু তারা তুলনামূলক বেশি ইম্পালসিভ হবে, তাৎক্ষণিক তৃপ্তির প্রতি বেশি দুর্বল হবে। ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি বোঝা কঠিন, কিন্তু জনসংখ্যাগত পর্যায়ে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তখন আবার মনে পড়ে আমেরিকায় বড় হওয়া বাংলাদেশি বাচ্চাদের কথা। তারা কি বাংলাদেশে বড় হলেও এতটা স্থির ও হাসিখুশি হতো?

বাংলাদেশের শিশুদের রক্তে বিষ

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে আসে ভয়াবহ সব তথ্য।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, লেড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ২০২৫ সালের MICS জরিপ বলছে, দেশের ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে WHO নির্ধারিত ইন্টারভেনশন থ্রেশহোল্ডের চেয়ে বেশি লেড রয়েছে। সংখ্যায় যা দুই কোটিরও বেশি শিশু।

২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আইসিডিডিআরবি ও স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় ঢাকার ২ থেকে ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর রক্ত পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, প্রতিটি শিশুর রক্তেই লেড আছে। গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকার প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশুর রক্তে লেডের মাত্রা আমেরিকার “ইমিডিয়েট অ্যাটেনশন নিডেড” পর্যায়ের চেয়েও বেশি।

এই লেড আসছে কোথা থেকে?

সবচেয়ে বড় উৎস অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং। দেশে ৩০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে। প্রতিটিতে পাঁচটি করে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহৃত হয়, যেগুলোর আয়ু ৬ থেকে ১১ মাস।

পুরোনো ব্যাটারিগুলো দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অনিয়ন্ত্রিত “ভাট্টি”-তে গলানো হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব ভাট্টি আবাসিক এলাকার ভেতরে। সেখান থেকে লেড বাতাস, পানি ও মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে।

স্ট্যানফোর্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, এসব শিল্প এলাকার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে লেডের মাত্রা অন্যদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয় বড় উৎস রং বা পেইন্ট। বাংলাদেশে লেডযুক্ত পেইন্ট আইনত নিষিদ্ধ হলেও বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ পেইন্টে এখনও বিপজ্জনক মাত্রায় লেড রয়েছে।

তৃতীয় উৎস রান্নাঘর। বহু বছর ধরে হলুদকে আরও উজ্জ্বল দেখাতে কিছু ব্যবসায়ী তাতে লেড ক্রোমেট মিশিয়ে আসছেন। কারণ বাজারে উজ্জ্বল হলুদকে “ভালো হলুদ” হিসেবে দেখা হয়। অর্থাৎ লেড ঢুকে গেছে আমাদের খাদ্যচক্রেও।

তবে লেড একমাত্র সমস্যা নয়।

হাজারীবাগের ট্যানারি থেকে ক্রোমিয়াম, ঢাকার দূষিত বাতাস, ইটভাটার ধোঁয়া, শিল্পকারখানার রাসায়নিক, গ্রামাঞ্চলের আর্সেনিকযুক্ত পানি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শিশুরা বড় হচ্ছে এক ধরনের রাসায়নিক ককটেলের মধ্যে।

একটি বিকাশমান মস্তিষ্কের পক্ষে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব।

একটি বিষাক্ত সমাজ কি সহিংস হয়ে ওঠে?

এখন যদি আমেরিকার সেই ২২ বছরের ব্যবধান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাবি, তাহলে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসে।

২০২৪-২৬ সালের মব ভায়োলেন্সে অংশ নেওয়া অনেক তরুণ জন্ম নিয়েছিল ২০০০ সালের শুরুতে। ঠিক তখনই দেশে দ্রুত বেড়েছে যানবাহন, ব্যাটারি রিসাইক্লিং, শিল্প দূষণ ও নগর দূষণ।

অর্থাৎ যে প্রজন্ম আজ সহিংসতায় জড়াচ্ছে, তারা বড় হয়েছে এমন এক পরিবেশে, যেখানে শৈশব থেকেই নিউরোটক্সিনের একাধিক উৎস তাদের ঘিরে ছিল।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের এই “মব জেনারেশন”-এর মস্তিষ্ক যেন বারুদের মতো হয়ে উঠেছে। সামান্য উসকানিতেই জ্বলে ওঠে।

বাংলাদেশের বাতাস, খাবার, পানি—সবকিছুর ভেতর দিয়েই তো এই প্রজন্ম বড় হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, সবাই এক ধরনের টিকিং বোমা হয়ে উঠছে।

তখন প্রশ্ন আসে—আমাদের সংস্কৃতির কতটুকু আসলে আমাদের কেমিস্ট্রি?

যে আচরণকে আমরা “অশিক্ষা”, “অসভ্যতা” বা “মৌলবাদ” বলে ব্যাখ্যা করি, তার কতটুকুর পেছনে শৈশবের রাসায়নিক ক্ষতি কাজ করছে?

লেড, ক্রোমিয়াম বা অন্যান্য নিউরোটক্সিনের প্রভাবে আইকিউ কমে যেতে পারে, আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে, তাৎক্ষণিক তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা বাড়তে পারে।

এর সঙ্গে যোগ হয় সহিংস পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অবক্ষয় এবং ডিজিটাল আসক্তি। ফলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে আরও অস্থির, আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠতে পারে।

এখন কী করা দরকার?

আমেরিকার গল্পে অন্তত একটি ইতিবাচক দিক ছিল। তারা গ্যাসোলিন থেকে লেড সরিয়েছিল। সময় নিয়ে হলেও সহিংস অপরাধ কমেছিল।

বাংলাদেশে এখনো তেমন কোনো সুস্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

অনিয়ন্ত্রিত ভাট্টি বাড়ছে। বায়ুদূষণ বাড়ছে। লেড পেইন্টের আইন থাকলেও প্রয়োগ দুর্বল। দূষণ একবার শরীরে ঢুকে গেলে তার ক্ষতি পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা যায় না। কেবল আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তাই এখনই কিছু পদক্ষেপ জরুরি।

লেড পেইন্টের আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আবাসিক এলাকা থেকে ব্যাটারি গলানোর ভাট্টি সরাতে হবে। হলুদসহ খাদ্যে লেডের উপস্থিতি নিয়মিত মনিটরিং করতে হবে। শিশুদের রক্তে লেড পরীক্ষা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচির অংশ করতে হবে।

কিন্তু শুধু পরিবেশগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশে শিশুদের বড় করার যে সংস্কৃতি—চিৎকার, ভয় দেখানো, মারধর—এসবও শিশুর প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিশুরা বড়দের দেখে শেখে। বাবা-মা যদি নিজেরাই ইম্পালস কন্ট্রোল না করেন, তাহলে শিশুরা সেটি শিখবে কীভাবে?

একইভাবে মব ভায়োলেন্সকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলাও বন্ধ করতে হবে। লিঞ্চিংয়ের ভিডিও শেয়ার করা, সহিংসতায় উল্লাস করা—এসবও সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে।

কারণ যতদিন সমাজ মব ভায়োলেন্সকে নীরবে মেনে নেবে, ততদিন বিষাক্ত পরিবেশে বড় হওয়া ক্ষতিগ্রস্ত মস্তিষ্কগুলো সেই দরজা দিয়েই সহিংসতার দিকে যাবে।

আমেরিকা তার লেড সংকট বুঝতে পেরেছিল বহু বছর পরে। বাংলাদেশের হাতে এত সময় নেই।

আজ যে শিশু ভাট্টির পাশে খেলছে, দূষিত বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে, লেডমিশ্রিত খাবার খাচ্ছে—তাকে এখনো বাঁচানো সম্ভব।

কিন্তু তার আগে স্বীকার করতে হবে—আমাদের শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্ক বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

আর হয়তো সবচেয়ে কঠিন কাজটাই সেটি—স্বীকার করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *