নিউইয়র্ক টাইমসের ‘সেরা গানলেখক’ তালিকা ঘিরে তুমুল বিতর্ক

২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস তাদের ম্যাগাজিন সংস্করণে প্রকাশ করে জীবিত আমেরিকানদের মধ্যে সর্বকালের সেরা ৩০ জন গানলেখকের তালিকা। তালিকাটি প্রকাশের পর থেকেই সংগীত অঙ্গন, সমালোচক মহল এবং সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

পত্রিকাটি জানায়, এই তালিকা তৈরিতে শত শত সংগীত বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়। সংগীতশিল্পী, সমালোচক, ইতিহাসবিদ, ডিজে এবং রেকর্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাহীদের কাছ থেকে ৭০০-এর বেশি নাম আসে। পরে নিউইয়র্ক টাইমস-এর ছয়জন সমালোচক দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেন।

ম্যাগাজিনের সম্পাদক ইন চিফ জ্যাক সিলভারস্টাইন বলেন, “আমেরিকার সেরা গানলেখক বাছাই করা খুবই ব্যক্তিগত, কঠিন এবং বিতর্কিত কাজ।”

তালিকায় স্থান পেয়েছেন বিভিন্ন প্রজন্ম ও সংগীত ধারার শিল্পীরা। হিপ-হপ থেকে আছেন জে-জেড ও কেন্ড্রিক ল্যামার । পপ সংগীত থেকে আছেন টেলর সুইফট এবং মারিয়া কেরি।

কান্ট্রি ও ফোক ধারার মধ্যে রয়েছেন ডলি পার্টন, লুসিন্ডা উইলিয়ামস এবং উইলি নেলসন। আর সোল ও আরঅ্যান্ডবি জগত থেকে জায়গা পেয়েছেন স্টিভি ওয়ান্ডার, স্মোকি রবিনসন, ক্যারল কিং এবং নীল রজার্স।

সমসাময়িক ন্যাশভিল ঘরানার গানলেখকদের মধ্যেও জায়গা পেয়েছেন জোশ অসবর্ন, ব্র্যান্ডি ক্লার্ক এবং শেন ম্যাকআনালি।

তালিকাটিকে আরও আকর্ষণীয় করতে প্রতিটি শিল্পীর সঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এবং সহকর্মী শিল্পীদের লেখা ব্যক্তিগত মূল্যায়ন। যেমন এরিকা বাদু লিখেছেন স্টিভি ওয়ান্ডার সম্পর্কে। মিশেল জাউনার লিখেছেন স্টেফিন মেরিট-কে নিয়ে। আর ব্রিটানি হাওয়ার্ড লিখেছেন ক্যারল কিং সম্পর্কে।

তালিকা প্রকাশের পরপরই প্রশ্ন উঠতে থাকে—এটি কি সত্যিই “সেরা গানলেখক”-এর তালিকা, নাকি জনপ্রিয় “হিটমেকার”-দের তালিকা?

সমালোচক ম্যাট বেরেনসন তার ব্লগে অভিযোগ করেন, তালিকায় এমন কিছু নাম রয়েছে যাদের দলের সদস্যরা আর জীবিত নন। উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন হল্যান্ড–ডোজিয়ার–হল্যান্ড-এর কথা। এই দলের সদস্য ল্যামন্ট ডোজিয়ার ২০২২ সালে মারা যান। একইভাবে অ্যাশফোর্ড ও সিম্পসন দলের সদস্য নিকোলাস অ্যাশফোর্ড মারা যান ২০১১ সালে।

সমালোচকদের আরেকটি আপত্তি ছিল “গানলেখক” শব্দের সংজ্ঞা নিয়ে। অনেকেই বলেন, হিপ-হপ দল আউটকাস্ট-এর ক্ষেত্রে পুরো দলকে মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। তাদের মতে, আন্দ্রে ৩০০০-এর গীতিকাব্যিক দক্ষতা স্বীকৃত হতে পারে, কিন্তু বিগ বোই-কে একই পর্যায়ে রাখা বিতর্কিত।

তালিকায় কারা আছেন, তার চেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে কারা নেই তা নিয়ে। অনেক সংগীতপ্রেমী বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে টম ওয়েটস, র‍্যান্ডি নিউম্যান, জ্যাকসন ব্রাউন, জেফ টুইডি, এইমি ম্যান, বেক, সুফজান স্টিভেন্স, জ্যাক হোয়াইট এবং জেসন ইসবেল-এর মতো শিল্পীরা তালিকায় স্থান পাননি।

অনেকে মনে করছেন, এই নামগুলো বাদ পড়া তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

বিতর্কের আরেকটি বড় অংশ ঘুরছে “হিট গান” এবং “মহৎ গানলেখা”-র পার্থক্য নিয়ে। সমালোচকদের একাংশের মতে, ডায়ান ওয়ারেন, লিওনেল রিচি, বেবিফেস, মারিয়া কেরি এবং দ্য-ড্রিম বাণিজ্যিকভাবে সফল গান তৈরি করেছেন ঠিকই, কিন্তু “সর্বকালের সেরা গানলেখক” হিসেবে তাদের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে।

তাদের প্রশ্ন, একজন মহান গানলেখকের মূল্যায়ন কি চার্টের সাফল্যে হবে, নাকি গানের ভাষা, আবেগ এবং সাংস্কৃতিক প্রভাব দিয়ে?

বিতর্ককে আরও উন্মুক্ত করতে দি নিউ ইয়র্ক টাইমস পাঠকদের জন্য অনলাইন ভোটের ব্যবস্থাও করেছে। সেখানে পাঠকেরা নিজেদের পছন্দের গানলেখকদের তালিকা জমা দিতে পারছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ দেখিয়ে দিয়েছে যে সংগীত কেবল বিনোদন নয়। এটি ব্যক্তিগত স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মগত অভিজ্ঞতার অংশ। ফলে “সেরা” নিয়ে ঐকমত্য তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব।

সংগীত সমালোচকদের একাংশ মনে করছেন, এই তালিকার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি নতুন করে গানলেখা নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে। পপ, রক, হিপ-হপ, কান্ট্রি, সোল এবং ইন্ডি—সব ধারাকে একসঙ্গে এনে তালিকাটি আমেরিকান সংগীতের বহুমাত্রিক চরিত্র তুলে ধরেছে।

তবে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—সেরা গানলেখক কে? যিনি সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় গান লিখেছেন, নাকি যিনি মানুষের অনুভূতিকে সবচেয়ে গভীরভাবে স্পর্শ করেছেন? সেই উত্তর হয়তো কখনোই এক হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *