ইরানে যুদ্ধ চালাতে ইরাকে গোপন সামরিক ঘাঁটি গড়ে ইসরায়েল

ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধে সহায়তার জন্য ইরাকের মরুভূমিতে গোপনে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছিল ইসরায়েল। যুদ্ধের শুরুর দিকে সেই ঘাঁটির খোঁজ প্রায় পেয়ে গিয়েছিল ইরাকি বাহিনী। তখন তাদের ঠেকাতে বিমান হামলাও চালায় ইসরায়েল। বিষয়টি জানিয়েছেন এ ঘটনার সঙ্গে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তি ও মার্কিন কর্মকর্তারা।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে এই গোপন ঘাঁটি গড়ে তোলে ইসরায়েল। পুরো বিষয়টি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রও জানত। ঘাঁটিটিতে বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। একই সঙ্গে এটি ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর জন্য রসদ ও সহায়তা কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করছিল।

সেখানে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দলও রাখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল—যদি কোনো ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়, তাহলে দ্রুত পাইলটদের উদ্ধার করা। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি পাইলটকে উদ্ধার করতে হয়নি।

এক ব্যক্তি জানান, ইসফাহানের কাছে একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে ইসরায়েল সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনীই নিজেদের দুই বিমানসেনাকে উদ্ধার করে। সেই অভিযানের নিরাপত্তায় সহায়তা দিতে ইসরায়েল বিমান হামলাও চালায়।

মার্চের শুরুর দিকে প্রায় ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল পুরো ঘাঁটির রহস্য। ইরাকের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এক রাখাল ওই এলাকায় অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতা দেখতে পান। তিনি হেলিকপ্টারের ওড়াউড়িও লক্ষ্য করেন। পরে তিনি বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানান। তদন্তে সেখানে সেনা পাঠায় ইরাকি বাহিনী।

ঘটনার সর্ম্পকে অবগত এক ব্যক্তি বলেন, ইরাকি সেনারা যাতে ঘাঁটির কাছে পৌঁছাতে না পারে, সেজন্য বিমান হামলা চালায় ইসরায়েল।

এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। তবে ওই হামলায় এক ইরাকি সেনা নিহত হন। তখন ইরাক সরকার প্রকাশ্যে ঘটনার নিন্দা জানায়।

ইরাকের যৌথ অভিযান কমান্ডের উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাউই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন,
“এই বেপরোয়া অভিযান কোনো সমন্বয় বা অনুমতি ছাড়াই চালানো হয়েছে।”

পরে মার্চ মাসে জাতিসংঘে করা এক অভিযোগে ইরাক জানায়, হামলায় বিদেশি বাহিনী ও বিমান হামলা জড়িত ছিল। সেখানে দায় চাপানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। কিন্তু বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন একজন বলেন, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল না।

ঘটনাটি ইরাকি ও আরব গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কারা এই হামলা চালিয়েছে, তা নিয়ে নানা জল্পনাও ছড়িয়ে পড়ে।

রাখালের খবর পাওয়ার পর ইরাকি সেনারা হামভি গাড়িতে করে ভোরবেলায় ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়। মুহাম্মাদাউই বলেন, পথে তারা তীব্র গোলাগুলির মুখে পড়ে। এতে এক সেনা নিহত ও আরও দুইজন আহত হন।

এরপর ইরাকের কাউন্টার টেররিজম সার্ভিসের আরও দুটি ইউনিট সেখানে পাঠানো হয়। ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তারা এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে বুঝতে পারে, সেখানে আগে থেকেই কোনো সামরিক বাহিনী অবস্থান করছিল।

মুহাম্মাদাউই বলেন,“হামলার আগে সেখানে কোনো একটি বাহিনী অবস্থান করছিল বলে মনে হচ্ছে। আকাশ থেকেও তাদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল। তাদের সক্ষমতা আমাদের ইউনিটগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।”

ইরাক সরকারের এক মুখপাত্র পরে এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি। ইসরায়েলের ওই ঘাঁটির বিষয়ে সরকার জানত কি না, সেটিও তিনি বলেননি।

নিজেদের ঘাঁটি ও স্বার্থ রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রও অতীতে ইরাকে একাধিক হামলা চালিয়েছে।

ইসরায়েল কীভাবে প্রায় এক হাজার মাইল দূরের ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ বিমান অভিযান চালিয়েছে, এই গোপন ঘাঁটির তথ্য সেই চিত্র আরও পরিষ্কার করে।

ইরাকের ওই ঘাঁটির কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক কাছাকাছি যেতে পেরেছিল ইসরায়েল। সেখানে সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ দল রাখার ফলে জরুরি উদ্ধার অভিযানেও দ্রুত সাড়া দেওয়া সম্ভব হতো।

ঘটনার সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিদের একজন জানান, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বিশেষ কমান্ডো ইউনিটের সদস্যরাও সেখানে ছিলেন। শত্রু অঞ্চলে গোপন অভিযান চালানোর জন্য তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

পাঁচ সপ্তাহের ওই যুদ্ধে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হাজার হাজার হামলা চালায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বড় সামরিক অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রও প্রায়ই অস্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করে। এপ্রিলের শুরুতে ভূপাতিত মার্কিন বিমানসেনাদের উদ্ধারে ইরানের ভেতরেও একটি অস্থায়ী ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ওই অভিযানে আটকে পড়া বিমান ও হেলিকপ্টার পরে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ধ্বংস করে দেয়।

কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, “অভিযানের আগে এমন জায়গা খুঁজে রাখা ও ঘাঁটি তৈরি করা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।”

তিনি বলেন, ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমি বিশাল ও জনবিরল। তাই অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটি তৈরির জন্য এটি আদর্শ এলাকা। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযানের সময়ও মার্কিন বিশেষ বাহিনী এই অঞ্চল ব্যবহার করেছিল।

নাইটস বলেন, বছরের পর বছর ধরে ওই মরুভূমির বাসিন্দারা নানা অদ্ভুত তৎপরতা দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কখনও ইসলামিক স্টেটের জঙ্গি, কখনও বিশেষ বাহিনীর অভিযান—সবই তারা দেখেছে। তাই এখন তারা সাধারণত এসব এলাকা এড়িয়ে চলে।

বর্তমান যুদ্ধের সময়ও স্থানীয় লোকজন তাকে জানিয়েছেন, তারা এলাকায় অস্বাভাবিক হেলিকপ্টার চলাচল দেখেছেন।

যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও গোপন অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মার্চের শুরুতে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর প্রধান টোমার বার নিজের বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে একটি চিঠি লেখেন।

সেখানে তিনি বলেন, “এই সময় বিমানবাহিনীর বিশেষ ইউনিটের যোদ্ধারা এমন কিছু বিশেষ মিশনে অংশ নিচ্ছে, যা মানুষের কল্পনাকেও হারিয়ে দিতে পারে।”

মে মাসের শুরুতে বিমানবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিজের দায়িত্ব শেষ করেন টোমার বার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *