কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখা গেছে। একজন স্কুলশিক্ষক দাবি করেছেন, পোড়া লুব্রিকেন্ট (মবিল) ও বিশেষ কেমিক্যাল মিশিয়ে ডিজেলচালিত ইঞ্জিন চালানো সম্ভব। বিষয়টি স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন।
উদ্যোক্তা মনির হোসেন দৌলতপুর উপজেলার বাসিন্দা। পেশায় তিনি শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডিজেলের বিকল্প জ্বালানি নিয়ে কাজ করছেন। তার দাবি, পাঁচ লিটার পোড়া মবিলের সঙ্গে ১০০ মিলিলিটার ‘বুস্টার’ মিশিয়ে সেচ পাম্প চালানো যাচ্ছে। এই বুস্টারের নাম দিয়েছেন ‘ম্যাথড অব অল্টারনেটিভ ডিজেল’ (এমএডি)।
সরেজমিনে ফিলিপনগর চর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ৩৫ থেকে ৪০টি স্যালো মেশিনে এই জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে। দৌলতপুরের আরও কয়েকটি এলাকায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। কৃষকরা বলছেন, ডিজেলের সংকটের কারণে তারা বিকল্প খুঁজছিলেন। এই পদ্ধতি তাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
মনির হোসেন জানান, ২০০৭ সাল থেকে তিনি এ নিয়ে কাজ শুরু করেন। শুরুতে ব্যর্থতা ছিল। ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দিত। পরে ধীরে ধীরে উপাদান পরিবর্তন করেন। তার ভাষ্য, বর্তমানে ১২টি উপাদানের মিশ্রণে তিনি কার্যকর ফল পেয়েছেন। ২০১৯ সালে চীনে প্রশিক্ষণ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও কাজে লেগেছে বলে জানান তিনি।
খরচের দিক থেকেও পার্থক্য রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। পাঁচ লিটার ডিজেলের জন্য যেখানে প্রায় ৫৭৫ টাকা লাগে, সেখানে পোড়া মবিল ও বুস্টারে খরচ হচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকা। কৃষকদের মতে, এতে সেচ খরচ কমছে। কেউ কেউ বলছেন, শব্দ ও ধোঁয়াও তুলনামূলক কম।
দৌলতপুরের কৃষক আবু বক্কর বলেন, এলাকায় ডিজেলের তীব্র সংকট চলছে। বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বিকল্প হিসেবে পোড়া মবিল ব্যবহার করছেন। আরেক কৃষক আমিনুল ইসলাম জানান, লোডশেডিং ও ডিজেল সংকট মিলিয়ে সেচে সমস্যা হচ্ছিল। নতুন এই পদ্ধতিতে কিছুটা সমাধান মিলছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে সংশয়ও আছে। দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের এখনো পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য আরও সতর্ক। গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের ফার্ম মেশিনারি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, সাধারণভাবে ডিজেল ইঞ্জিনে অন্য জ্বালানি ব্যবহারের কথা নয়। এতে ইঞ্জিনের ক্ষতি হতে পারে। বাস্তবে কীভাবে এটি চলছে, তা পরীক্ষা করা জরুরি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, পোড়া মবিল উচ্চমাত্রায় দূষিত। এতে ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর উপাদান থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ইঞ্জিনের ইনজেকশন সিস্টেম ও পিস্টনের ক্ষতি করতে পারে। পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও থাকে।
সব মিলিয়ে কুষ্টিয়ার এই উদ্যোগ একদিকে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে তৈরি করছে নতুন প্রশ্ন। এটি কি সত্যিই টেকসই সমাধান, নাকি সাময়িক বিকল্প—তা নির্ভর করছে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও সরকারি যাচাইয়ের ওপর।