প্রতিদিনকার কসাইখানায় এক অস্বস্তিকর দৃশ্য। গরু জবাইয়ের পরপরই কসাই ছুরির ডগা দিয়ে গলার ভেতরে খোঁচা দেন। সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীর নড়াচড়া থেমে যায়। রক্ত পড়াও কমে আসে। এরপর দ্রুত শুরু হয় চামড়া ছাড়ানো। পুরো প্রক্রিয়ায় রক্ত বের হওয়ার সময়ই দেওয়া হয় না।
এ ধরনের চর্চা দেশের অনেক কসাইখানায় নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের। এতে মাংস দেখতে টকটকে লাল থাকে। অনেকেই এটিকে “তাজা” মনে করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন।
একটি পূর্ণবয়স্ক গরুর শরীরে গড়ে ২০ থেকে ২৫ লিটার রক্ত থাকে। জবাইয়ের পর স্বাভাবিক নিয়মে এই রক্ত বের হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু দ্রুত চামড়া ছাড়ানোর জন্য অনেক কসাই রক্ত বের হওয়ার সময় দেন না।
অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীর স্পাইনাল কর্ডে আঘাত করা হয়। এতে প্রাণী দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। রক্ত চলাচল থেমে যায়। ফলে শরীরের ভেতরে রক্ত জমে থাকে। এতে মাংসের ওজনও কিছুটা বাড়ে। কসাইদের একটি অংশ এটিকে লাভজনক মনে করেন।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্ত জমে থাকা মাংস স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। রক্তে বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ থাকতে পারে। এর মধ্যে ইউরিয়া, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকার সম্ভাবনা থাকে।
সঠিকভাবে রক্ত বের না হলে এসব উপাদান মাংসেই থেকে যায়। এতে হজমে সমস্যা হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে চুলকানি বা অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। দ্রুত পচনের ঝুঁকিও বাড়ে।
অনেক ভোক্তা অভিযোগ করেন, গরুর মাংস খেলেই তাদের অস্বস্তি হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে মাংস দায়ী নয়। কিন্তু অপর্যাপ্ত রক্ত অপসারণ একটি বড় কারণ হতে পারে।
অনেকেই বলেন, কোরবানির সময় মাংস খেলে সমস্যা কম হয়। এর একটি কারণ হতে পারে, তখন জবাইয়ের পর পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়। রক্ত বের হওয়ার সুযোগ থাকে। ফলে মাংস তুলনামূলকভাবে নিরাপদ থাকে।
কসাইদের একটি প্রচলিত দাবি হলো, বেশি সময় দিলে চামড়া ছাড়ানো কঠিন হয়। তবে অভিজ্ঞদের মতে, এই যুক্তির শক্ত ভিত্তি নেই। বরং সঠিক পদ্ধতি হলো প্রাণীকে ঝুলিয়ে চামড়া ছাড়ানো। এতে রক্ত বের হওয়াও সহজ হয়।
শহরের অধিকাংশ কসাইখানায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ এ বিষয়ে কার্যকর তদারকি খুবই সীমিত। ভোক্তারাও সচেতন নন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক জবাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি। এতে শুধু ধর্মীয় দিক নয়, জনস্বাস্থ্যের বিষয়ও জড়িত।
- জবাইয়ের পর পর্যাপ্ত সময় রক্ত বের হতে দিতে হবে
- স্পাইনাল কর্ডে আঘাত করা থেকে বিরত থাকতে হবে
- স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে মাংস প্রক্রিয়াজাত করতে হবে
- প্রশাসনিক তদারকি বাড়াতে হবে
- ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে
সামান্য বাড়তি লাভের জন্য ঝুঁকি তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। নিরাপদ মাংস নিশ্চিত করতে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।