দেশে চলমান বিদ্যুৎ সংকটের সুযোগে সোলার বাজারে অনিয়ম ও প্রতারণা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা নকল ও নিম্নমানের পণ্য বাজারে ছাড়ছে, যার ফলে সাধারণ ক্রেতারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে দুই ধরনের নকল সোলার প্যানেল বেশি দেখা যাচ্ছে। প্রথমত, নিম্নমানের বা সস্তা পণ্যের গায়ে পরিচিত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের স্টিকার লাগিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বড় ব্র্যান্ডগুলোর কারখানা বা গুদাম থেকে মান নিয়ন্ত্রণে (QC) বাদ পড়া বা ত্রুটিপূর্ণ প্যানেল কম দামে সংগ্রহ করে দেশে এনে বিক্রি করা হচ্ছে।
এই দুই ক্ষেত্রেই সাধারণ ক্রেতার পক্ষে আসল ও নকল পণ্য আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
শুধু প্যানেল নয়, সোলার সিস্টেমের অন্যান্য উপকরণেও সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এসিড ব্যাটারির ঘাটতি দেখা দেওয়ায় লিথিয়াম ব্যাটারির দাম প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
একইভাবে, বাজারে ভালো মানের ইনভার্টারের সরবরাহ কমে গেছে। ছোট ক্ষমতার (১ থেকে ২ কিলোওয়াট) ইনভার্টারগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিম্নমানের বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গৃহস্থালি ব্যবহারের জন্য নির্ভরযোগ্য সিস্টেম চাইলে ২.৫ থেকে ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার ইনভার্টার বিবেচনা করা নিরাপদ।
সোলারের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই খাতে নতুন ব্যবসায়ীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে। অনেকেই যাদের আগে এই খাতের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, তারাও এখন সোলার পণ্য বিক্রিতে যুক্ত হচ্ছেন। রাজধানীর কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এমন অস্থায়ী ও অনভিজ্ঞ বিক্রেতার উপস্থিতি বেশি দেখা যাচ্ছে।
অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ও প্রচারণার মাধ্যমে সহজ সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর।
ইন্টারনেট, ইউটিউব ভিডিও বা বিভিন্ন অনলাইন পরামর্শের ওপর নির্ভর করে অনেকেই নিজেরা সোলার সিস্টেম বসানোর চেষ্টা করছেন। তবে সঠিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান না থাকায় তারা নিম্নমানের পণ্য কিনে ফেলছেন এবং পুরো সিস্টেমটি প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে না।
ফলে বিনিয়োগের তুলনায় সুবিধা না পেয়ে অনেকেই হতাশ হচ্ছেন।
জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোলার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তাড়াহুড়ো করে বা যাচাই-বাছাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নিলে ক্ষতির ঝুঁকি বেশি।
তারা পরামর্শ দিচ্ছেন—
- বিশ্বস্ত সরবরাহকারী ও অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে পণ্য কেনা
- পণ্যের ওয়ারেন্টি ও সার্টিফিকেশন যাচাই করা
- প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া
এছাড়া বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাও একটি নিরাপদ কৌশল হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সোলারের চাহিদা বাড়া স্বাভাবিক। তবে এই সুযোগে বাজারে যে অনিয়ম তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। সচেতনতা ও ধৈর্য—এই দুইটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।