বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ড্র হওয়ার পর নরওয়ের ফুটবল মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শুধু মাঠের খেলা নয়, বরং আরও বড় একটি প্রশ্ন—ইসরায়েলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলবে কীভাবে, এবং গাজা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ইসরায়েলের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন শুরু থেকেই স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা ইসরায়েলের বিপক্ষে একতরফা ম্যাচ বয়কটের পথে হাঁটবে না। বরং ফিফা ও উয়েফার বিদ্যমান নিয়ম ও কাঠামোর মধ্য দিয়েই ইসরায়েলের সদস্যপদ স্থগিত করার দাবি তুলবে।
এই প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিস ক্ল্যাভেনেস। সাবেক জাতীয় দলের ফুটবলার ও পেশায় আইনজীবী ক্ল্যাভেনেস বর্তমানে উয়েফার নির্বাহী কমিটির সদস্যও। ফলে ইউরোপীয় ফুটবলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার অবস্থান এই উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ড্রয়ের পর ক্ল্যাভেনেস প্রকাশ্যে ফিফার কাছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তদন্তের আহ্বান জানান। পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওসলোতে ইসরায়েলের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচের আগে তিনি আরও স্পষ্ট অবস্থান নেন।
তার ভাষায়, “আমরা বিশ্বাস করি ইসরায়েলকে সাসপেন্ড করা উচিত। এটি রাজনৈতিক নয়, বরং বিদ্যমান নিয়মের সঠিক প্রয়োগের বিষয়।”
ওই ম্যাচে নরওয়ে ৫-০ গোলের বড় জয় পেলেও ক্ল্যাভেনেস বলেন, নরওয়ে এককভাবে ম্যাচ বয়কট করবে না। কারণ এতে ইসরায়েল বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়ে বিশ্বকাপে ওঠার সুবিধা পেতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা নীতিগতভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু একা বয়কট করলে লাভ হবে না। এতে ইসরায়েলই সুবিধা পাবে।”
নরওয়ের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে একটি তুলনা।
২০২২ সালে ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর ফিফা ও উয়েফা দ্রুত রাশিয়ার জাতীয় ও ক্লাব দলগুলোকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করে। কিন্তু গাজায় দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের পরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ক্ল্যাভেনেস এবং নরওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই ভিন্ন আচরণ আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন তুলছে। তাদের দাবি, যদি ফিফার মানবাধিকার নীতি ও নিয়ম সবার জন্য সমান হয়, তাহলে সেগুলোর প্রয়োগও সমান হওয়া উচিত।
নরওয়ের অবস্থান নতুন কোনো দাবির সূচনা নয়। এর আগে ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (PFA) বহু বছর ধরে ফিফার কাছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানায়। তাদের অভিযোগের মধ্যে ছিল—
- গাজায় যুদ্ধের কারণে ক্রীড়া অবকাঠামোর ধ্বংস,
- ফিলিস্তিনি খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগ,
- দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরায়েলি বসতির ক্লাবগুলোর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ।
PFA-এর দাবি, এসব বিষয় ফিফার বিধি এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নরওয়ের অবস্থানকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, ফিলিস্তিনি খেলোয়াড় ও বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে চলমান লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করার মাধ্যমে নরওয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নরওয়ের এই অবস্থান কেবল সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল নয়।
ক্ল্যাভেনেস জানিয়েছেন, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নরওয়ে ফিলিস্তিনি ফুটবল উন্নয়নে সরাসরি কাজ করছে। নারী ফুটবল কোচদের প্রশিক্ষণ, স্কুল ও শরণার্থী শিবিরে শিশুদের জন্য ফুটবল কার্যক্রম পরিচালনাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে নরওয়ে যুক্ত রয়েছে।
তার মতে, এই দীর্ঘমেয়াদি সম্পৃক্ততাই তাদের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ওসলোর উল্লেভাল স্টেডিয়ামে নরওয়ে-ইসরায়েল ম্যাচটি ছিল কেবল একটি বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচ নয়।
নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশন ম্যাচের টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ গাজায় চিকিৎসা সহায়তার জন্য দান করে। স্টেডিয়ামে অসংখ্য দর্শক ফিলিস্তিনি পতাকা ও কেফিয়েহ পরে উপস্থিত হন। গ্যালারিতে “Let Children Live” লেখা বড় ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।
স্টেডিয়ামের বাইরে শত শত মানুষ ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভও করেন।
এ পর্যন্ত ফিফা ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে নিষিদ্ধ করেনি।
২০২৫ সালের মার্চে দখলকৃত পশ্চিম তীরের বসতি এলাকার ক্লাবগুলোর বিষয়ে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়।
তবে একই সময়ে বৈষম্যবিরোধী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে ১ লাখ ৫০ হাজার সুইস ফ্রাঙ্ক জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি বৈষম্যবিরোধী শিক্ষা কর্মসূচি ও নজরদারি ব্যবস্থা চালুর নির্দেশও দেয় ফিফা।
বিশ্লেষকদের মতে, নরওয়ের এই উদ্যোগের গুরুত্ব এখানেই যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার দাবি এবার শুধু আরব বা এশীয় ফুটবল সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি ইউরোপীয় ফুটবলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
নরওয়ে ইউরোপের সেই কয়েকটি দেশের একটি, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। স্পেন ও আয়ারল্যান্ডও একই অবস্থান নিয়েছে।
নরওয়ের জাতীয় দলের কোচ স্টলে সলবাকেনও বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন।
তার ভাষায়, “এটি বড় একটি আলোচনার বিষয় হতে যাচ্ছে, এবং সেটাই স্বাভাবিক। ওই অঞ্চলে যা ঘটেছে, তা বিবেচনায় নিলে এই আলোচনা হওয়াই উচিত।”
নরওয়ের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—খেলাধুলা কি সত্যিই রাজনীতি ও মানবাধিকার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা থাকতে পারে?
একদিকে রয়েছে ফিফার নিরপেক্ষতার নীতি, অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার ভূমিকা নিয়ে ক্রমবর্ধমান বিতর্ক।
নরওয়ের অবস্থান স্পষ্ট। দেশটির ফুটবল ফেডারেশনের মতে, ফুটবলের নিয়ম ও মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তব অর্থেই সর্বজনীন হয়, তাহলে তার প্রয়োগও সব দেশের ক্ষেত্রে একই মানদণ্ডে হওয়া উচিত।