হাঙ্গেরিতে সংবিধান সংশোধন, প্রেসিডেন্টকে অপসারণের পথে মাগ্যার সরকার

হাঙ্গেরির সংসদে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবিধান সংশোধনী পাস হয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটির প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিওককে পদ থেকে অপসারণের পথ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পিটার মাগ্যারের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার বলছে, এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে সরানোর উদ্যোগ নয়; বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের অংশ।

এই পদক্ষেপ এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ১৬ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ভিক্টর অরবান ও তাঁর দল ফিদেসকে নির্বাচনে পরাজিত করে ক্ষমতায় আসে মাগ্যারের তিসজা পার্টি।

চলতি বছরের ১২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তিসজা পার্টি বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে। প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার অংশ নেন এই নির্বাচনে। ১৯৯ সদস্যের সংসদে দলটি ১৪১টি আসন জিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক ক্ষমতা পায় নতুন সরকার।

নির্বাচনে জয়ের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই পিটার মাগ্যার ঘোষণা করেন, হাঙ্গেরিতে “অরবান যুগের সমাপ্তি” ঘটেছে। একই সঙ্গে তিনি দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের পদত্যাগের আহ্বান জানান। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রেসিডেন্ট তামাস সুলিওক, প্রসিকিউটর জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট ও সাংবিধানিক আদালতের প্রধান, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিচালকসহ আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

সরকারের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট সুলিওকসহ এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা অরবান সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং তারা আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রভাব বহন করছেন। নতুন সরকারের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে পুনর্গঠন না করলে গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে অপসারণের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর সংস্কার পরিকল্পনারই অংশ।

পিটার মাগ্যারের সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি বড় সংস্কার কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা আট বছরে সীমাবদ্ধ করা।
  • বিচার বিভাগ, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো।
  • ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
  • দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

মাগ্যার সরকারের ভাষ্য, এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।

হাঙ্গেরির রাজনৈতিক পরিবর্তন ইউরোপজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লেইন নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “আজ রাতে হাঙ্গেরিতে ইউরোপের হৃৎস্পন্দন আরও জোরালো হয়েছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও এটিকে শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের গণতন্ত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে রাশিয়া তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া জানায়। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, হাঙ্গেরির জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মস্কো সেটিকে সম্মান করে।

তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই প্রেসিডেন্টকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়ায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তাদের যুক্তি, ভিক্টর অরবানের সময়ও সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার অভিযোগ উঠেছিল। তাই বর্তমান সরকার একই ধরনের সাংবিধানিক শক্তি ব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে ভবিষ্যতে নতুন ধরনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে সরকার বলছে, তাদের লক্ষ্য ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা।

হাঙ্গেরির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অরবানের দীর্ঘ শাসনের পর নতুন সরকার দ্রুতগতিতে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে।

এই সংস্কার শেষ পর্যন্ত হাঙ্গেরিতে আরও শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেবে—তা সময়ই বলে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *