মারুফ আহমেদ
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত ‘জাস্ট থট এডুকেশন কনসালট্যান্ট’-এর মালিক মো. মতিউরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভাটারা থানা-পুলিশ জানিয়েছে, বিদেশে পালানোর চেষ্টা করার সময় সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উত্তরা এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে তাকে ভাটারা থানায় রাখা হয়েছে। প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আলোচনায় এসেছে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি বড় শিক্ষা-ভিসা প্রতারণার অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার নামে প্রতিষ্ঠানটি কয়েক শ শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ নিয়েছে। পরে প্রতিশ্রুতি পূরণ না করে অফিস বন্ধ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আত্মগোপনে চলে যান।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর নর্দা এলাকায় একটি সুসজ্জিত অফিস থেকে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে কানাডা, ইউরোপের শেনজেনভুক্ত দেশসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। বিশেষ করে ‘১০০ শতাংশ ভিসা নিশ্চিত’ ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করা হয়।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ৩০০ থেকে ৫০০ পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, মোট অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তবে এই অঙ্কের সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনও পাওয়া যায়নি।
ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘ সময় নানা অজুহাতে অপেক্ষা করানোর পর একপর্যায়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ফোন নম্বরও বন্ধ পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন, তারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
গত কয়েক দিনে রাজধানীতে একাধিক মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন ক্ষতিগ্রস্তরা। সেখানে তারা অর্থ ফেরত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নীলিমা নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, কানাডায় পড়তে পাঠানোর আশায় তার বাবা গ্রামের ৩১ শতক জমি বিক্রি করেছিলেন। সেই অর্থ প্রতিষ্ঠানটিকে দেওয়া হয়। এখন টাকা নেই, বিদেশে যাওয়ার সুযোগও হয়নি। পুরো পরিবার চরম সংকটে পড়েছে।
সিলেটের বাসিন্দা আব্দুল মুনিম জানান, ২০২৪ সালের ২রা জুন দুই সন্তানকে বিদেশে পাঠানোর জন্য টিউশন ফিসহ ১৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন তিনি। তিন বছরেও সন্তানদের বিদেশে পাঠানো হয়নি। তার কাছে অর্থ গ্রহণের রসিদ, চেক এবং রিফান্ড-সংক্রান্ত নথি রয়েছে বলে দাবি করেন। চুক্তি অনুযায়ী টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মতিউর রহমান, সিইও মুসফিকুর রহমান, কনসালট্যান্ট মাহমুদা কাজল, ভিসা সেন্টারের তুলি, হিসাবরক্ষক নাজমুল, রিফান্ড-সংক্রান্ত দায়িত্বে থাকা হায়দারসহ আরও কয়েকজন এই কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে এখনও প্রমাণিত হয়নি। আইনগতভাবে তারা বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচিত হবেন।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, আগে ভাটারা থানায় মামলা হলেও মূল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক গ্রেপ্তারের পর তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
মানববন্ধনে চার দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
- প্রতারণার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত।
- ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ দ্রুত ফেরত।
- জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
- বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে পরিচালিত সব কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর সরকারি নজরদারি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, প্রতারণার কারণে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় পড়েছে। কেউ জমি বিক্রি করেছেন, কেউ ধার করেছেন। কয়েকটি পরিবারে চরম অশান্তি তৈরি হয়েছে। আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। তবে এসব দাবির যাচাই সম্ভব হয়নি।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারণা এখন উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। এতে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই হয় না, শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময়ও নষ্ট হয়। অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর শিক্ষা-পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে এবং পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটে পড়ে।
তাদের মতে, বিদেশে শিক্ষার্থী পাঠানোর নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন, আর্থিক লেনদেন এবং বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি জরুরি। একই সঙ্গে ভিসা নিশ্চিত করার নামে বিভ্রান্তিকর প্রচারণার বিরুদ্ধেও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া মতিউর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে প্রতারণার সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।