শব্দ, স্মৃতি ও সাহিত্যপ্রেমের এক অনন্য উদযাপন

কুমিল্লার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’। রবিবার (১২ই জুলাই ) সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, কুমিল্লা কেন্দ্রে সংগঠনটির শততম পর্ব উদযাপিত হয়। “শব্দে শব্দে জীবন” প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে কবি, লেখক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী এবং সাহিত্যপ্রেমীরা অংশ নেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই শততম পর্ব উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ স্মারকের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পরে স্মারকটির মূল্যায়ন, সংগঠনের দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তারা বলেন, একটি শহরের সাংস্কৃতিক পরিচয় কেবল তার স্থাপনা বা ইতিহাসে নয়, বরং সাহিত্যচর্চা, শিল্পচর্চা এবং মানুষের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়। তাঁদের মতে, নিয়মিত সাহিত্য আড্ডা নতুন লেখক তৈরি করে, চিন্তার পরিসর বাড়ায় এবং সমাজে মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে।

সচেতন রাজনৈতিক ফোরাম, কুমিল্লার প্রধান সমন্বয়ক ড. শাহ্ মোহাম্মদ সেলিম বলেন, সাহিত্যচর্চা একটি সমাজে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিকতা ও সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’কে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের সাম্য, মানবতা ও বিদ্রোহী চেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর মতে, সাহিত্য মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহসও জোগায়।

অধ্যাপক ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাহিত্য আড্ডা শুধু মতবিনিময়ের স্থান নয়; এটি মানুষে মানুষে সম্পর্ক গড়ে তোলা, নতুন চিন্তার জন্ম দেওয়া এবং একটি সুন্দর সমাজ নির্মাণের কার্যকর মাধ্যম।

এছাড়া প্রফেসর জামাল নাসের, এস. এস. খায়রুল আলম খসরু, অধ্যাপক শ্যামা প্রসাদ ভট্টাচার্য, অ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক, ড. আবুল বাসার, অ্যাডভোকেট মো. মাহাবুবুর রহমান, রীতা সরকার, অ্যাডভোকেট স্বর্ণ কমল নন্দী পলাশ, পীযুষ কুমার ভট্টাচার্য এবং রীতা চক্রবর্তীসহ অন্যান্য বক্তা সংগঠনটির শততম পর্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে নিষ্ঠা, ভালোবাসা এবং সাংগঠনিক অঙ্গীকার।

অনুষ্ঠানজুড়ে কবিতা আবৃত্তি, সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং মুক্ত মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে প্রবীণ ও তরুণ সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে এক আন্তরিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বক্তারা নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

সংগঠনটির কর্ণধার হালিম আব্দুল্লাহ পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। বক্তারা তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহিত্যপ্রেম এবং দীর্ঘদিন ধরে এই সাহিত্য আড্ডাকে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন।

আয়োজকদের মতে, শততম পর্ব কেবল একটি সংখ্যাগত অর্জন নয়; এটি দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চা, মানুষের অংশগ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গীকারের প্রতীক। প্রযুক্তিনির্ভর সময়েও কুমিল্লার বিপুলসংখ্যক মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, সাহিত্য এখনো মানুষের অনুভূতি, চিন্তা এবং সামাজিক সংযোগের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।

দীর্ঘ এক যাত্রার এই মাইলফলক উদযাপনের মাধ্যমে ‘জোড়া শালিক সাহিত্য আড্ডা’ ভবিষ্যতেও নিয়মিত সাহিত্যচর্চা, সৃজনশীল সংলাপ এবং নতুন প্রজন্মকে বই ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *