তাপস চন্দ্র সরকার
বিধাতা একেকজন মানুষকে পাঠায় একেক রকম জাদুকরী ক্ষমতা দিয়ে। কেউ কেউ এক হাতে মানুষের শরীরের ক্ষত সারানোর বিদ্যা রপ্ত করে, আবার অন্য হাতে মানুষের মনের ক্লান্তি দূর করার সুর বুনে যায়। চিকিৎসা আর সংগীত—সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ভুবনকে কী আশ্চর্য মায়ায় একসূত্রে বেঁধেছেন কুমিল্লার এক কুঁড়ি বছর বয়সী তরুণী। নাম তাঁর স্নিহা চক্রবর্তী। যিনি ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, আবার একই সঙ্গে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
“মানুষের শরীরটা সুস্থ করে বিজ্ঞান, আর মনটা ভালো করে সুর। এই দুইয়ের মিলন যেখানে হয়, সেখানে এক অদ্ভুত সুন্দর পৃথিবী জন্ম নেয়।” স্নিহা ঠিক তেমনই একজন মানুষ, যিনি মেডিকেলের অ্যানাটমি, ফিজিওলজির মতো কঠিন আর সময়সাপেক্ষ পড়াশোনার মাঝেও সংগীতের জগৎ থেকে নিজেকে এক মুহূর্তের জন্যও হারিয়ে যেতে দেননি। তাঁর বিশ্বাস খুব সরল—চিকিৎসা মানুষের শরীরকে ভালো রাখে, আর সংগীত সুস্থ রাখে মানুষের মনকে।
শৈশব থেকেই সুরের প্রতি এক অবিনাশী অনুরাগ ছিল স্নিহার। বাবা ভজন চক্রবর্তী কুমিল্লার আড্ডা ডিগ্রি কলেজের জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক, আর মা স্মৃতি শর্মা এক স্নেহময়ী গৃহিণী। কুমিল্লা নগরের কান্দিরপাড় এলাকার নিজস্ব বাসভবন ‘কল্যাণী কুঞ্জ’-এর চেনা আঙ্গিনায় ছোটবেলা থেকেই তিনি বড় হয়েছেন সাহিত্য, নৈতিক মূল্যবোধ আর সংস্কৃতির এক অপরূপ আবহে। দুই বোনের মধ্যে স্নিহা বড়, তাঁর ছোট বোন ভূমি চক্রবর্তীও একজন প্রতিভাবান আবৃত্তিশিল্পী। পুরো পরিবারটি যেন এক টুকরো সুরের বাগান।
বিগত দীর্ঘ সাতটি বছর ধরে স্নিহা তালিম নিয়েছেন বিশিষ্ট সংগীত গুরু অধ্যাপক দিলীপ মজুমদারের কাছে। প্রতিদিনের কঠোর অনুশীলন আর রাগ-রাগিণীর সূক্ষ্ম ব্যাকরণ আয়ত্ত করে তিনি আজ বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী। শুধু তাই নয়, জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় রবীন্দ্রসংগীত ও উচ্চাঙ্গসংগীতে একাধিকবার জেলা পর্যায়ে প্রথম স্থান এবং বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
সংগীতবোদ্ধাদের মতে, স্নিহার কণ্ঠে রয়েছে এক অন্যরকম স্বচ্ছতা আর মাধুর্য। তাঁর পরিবেশনায় যেমন থাকে শাস্ত্রীয় সংগীতের শুদ্ধতা, তেমনি থাকে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো গভীর আবেগ। যখন তিনি রবীন্দ্রসংগীতের কোনো চেনা পঙ্ক্তি ধরেন, তখন শ্রোতাদের মনে হয়—পৃথিবীটা এখনো খুব সুন্দর।
মেডিকেলের সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে স্টেথোস্কোপ হাতে নেওয়ার ব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিয়মিত রেওয়াজ করেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে স্নিহা মৃদু হেসে বলেন, “আমি একজন দক্ষ ও মানবিক চিকিৎসক হতে চাই। চিকিৎসা মানুষের দেহের কষ্ট লাঘব করে, আর সংগীত মানুষের মনের ব্যথা দূর করে। এই দুই সেবার মধ্য দিয়েই আমি আজীবন মানুষের পাশে থাকতে চাই।”
শিক্ষক অধ্যাপক দিলীপ মজুমদার তাঁর এই প্রিয় ছাত্রীকে নিয়ে ভীষণ আশাবাদী। তিনি বলেন, “স্নিহা অত্যন্ত অধ্যবসায়ী এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠিন পড়াশোনার পাশাপাশি সে যেভাবে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ভবিষ্যতে সে যেমন একজন সফল চিকিৎসক হবে, তেমনি দেশের সংগীতাঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”
আজকের এই প্রতিযোগিতাপূর্ণ সময়ে যখন অনেক তরুণ-তরুণী সংস্কৃতিচর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে স্নিহা চক্রবর্তী এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। তিনি প্রমাণ করেছেন—অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর স্বপ্নের প্রতি অবিচল বিশ্বাস থাকলে বিজ্ঞান আর শিল্পকে একসঙ্গেই ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে রাখা যায়।
সাদা অ্যাপ্রনের গুরুদায়িত্ব আর সুরের অনন্ত সাধনা—দুটি পথেই সমান নিষ্ঠায় এগিয়ে চলা এই তরুণী আগামী দিনে দেশের সংগীতাঙ্গন এবং চিকিৎসা জগত—উভয় ক্ষেত্রেই এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা হয়ে উঠবেন, এক মায়াবী বিকেলে এমন প্রত্যাশাই করছেন তাঁর শিক্ষক, পরিবার আর চেনা শহরের সকল সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ।