অক্টোবরে ইসরায়েলের নির্বাচন: যুদ্ধ, জনঅসন্তোষ ও আইসিসির চাপের মুখে নেতানিয়াহু

ইসরায়েলে ২৭শে অক্টোবর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশটির সংসদ নেসেট নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। ফলে বর্তমান নেসেট পূর্ণ চার বছরের মেয়াদ শেষ করবে, যা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এই নির্বাচনকে শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গাজা যুদ্ধ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংকট নিয়ে ভোটারদের রায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু আবারও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। তবে বিভিন্ন জনমত জরিপে তার জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত মিলছে। বিরোধী শিবিরও নতুন নেতৃত্বের অধীনে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

২০২৩ সালের ৭ই  অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ এখনো ইসরায়েলের রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু। দীর্ঘ এই সংঘাতে ইসরাইলি হামলায় হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল বলছে, হামাসকে নির্মূল করা এবং জিম্মিদের মুক্ত করাই তাদের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য।

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইসরায়েলের ভেতরেও অসন্তোষ বেড়েছে। অনেক পরিবার এখনো জিম্মিদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন করছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপও বাড়ছে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, নেতানিয়াহুর প্রতি জনসমর্থন আগের তুলনায় কমেছে। নিরাপত্তা পরিস্থিতি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং সরকার পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেক ভোটার।

জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের ৯২ শতাংশের বেশি নাগরিক মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইরান জয়লাভ করেছে। একইসাথে নেতানিয়াহুর প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন মার্চের ৪০.৫ শতাংশ থেকে জুনে নেমে এসেছে ২৯.৪ শতাংশে। সাবেক সেনা প্রধান গাদি আইজেনকোট তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। যদিও নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক জোটগুলোর চূড়ান্ত রূপ এখনো স্পষ্ট নয়।
জনগণের মধ্যে ক্ষোভের আরেকটি কারণ ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধের পর স্থবির হওয়া যুদ্ধবিরতি। এই যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা অনেক ইসরায়েলির কাছে তাদের দেশের জন্য অনুকূল নয় বলে মনে হচ্ছে। এর সাথে যোগ হয়েছে একাধিক নিরাপত্তা ব্যর্থতার প্রসঙ্গ।

নেতানিয়াহুর ওপর আন্তর্জাতিক চাপও বেড়েছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বার ১ নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তার জনপ্রিয়তায় আরও ধসের কারণ।  অভিযোগের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, হত্যা এবং নিপীড়নের অভিযোগও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোসহ একাধিক দেশ নেতানিয়াহুকে গাজায় গণহত্যার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে অভিযুক্ত করেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৭৫,০০০ ফিলিস্তিনি, যাদের বেশিরভাগ নারী ও শিশু, নিহত হয়েছেন। যদিও ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে মার্কিন মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চলছে, তবে ইসরায়েল তা বারবার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইসরায়েল আইসিসির এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এই পরোয়ানা নেতানিয়াহুর আন্তর্জাতিক সফর এবং কূটনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে।

নির্বাচনের আগে আরেকটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে অতি-অর্থোডক্স বা হারেদি ইহুদিদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি।

নেতানিয়াহুর জোটের ধর্মীয় দলগুলো এই অব্যাহতি বজায় রাখতে চায়। বিপরীতে সেনাবাহিনী এবং সমাজের বড় একটি অংশ মনে করে, দীর্ঘ যুদ্ধের বাস্তবতায় সব নাগরিকের সমানভাবে সামরিক দায়িত্ব পালন করা উচিত।

এই ইস্যুতে মতবিরোধ জোট সরকারের জন্যও রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করেছে।

অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহু কতটুকু টিকে থাকতে পারেন, তা নির্ভর করছে তার ডানপন্থী জোটের ঐক্য এবং বিরোধী শক্তিগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্যের ওপর। সাবেক সেনা প্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে একটি বিকল্প জোট গঠিত হলে, দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি রাজনীতিতে প্রভাবশালী নেতানিয়াহুর শাসনের অবসান হতে পারে। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনে সংকট নতুন নয়। অতীতেও একাধিকবার তিনি কঠিন পরিস্থিতি থেকে ফিরে এসে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, জোটের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং জনসমর্থনের ওঠানামা—সব মিলিয়ে ২৭শে অক্টোবরের নির্বাচন ইসরায়েলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভোটে পরিণত হয়েছে।

এই নির্বাচনের ফল শুধু দেশটির পরবর্তী সরকারই নির্ধারণ করবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এবং ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক অবস্থানেও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *