আলজেইমার ও পারকিনসন প্রতিরোধে নতুন আশার আলো: গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে টিউবুলিন প্রোটিন

ডাঃ মশিউর রহমান

আলজেইমার ও পারকিনসনের মতো স্নায়ুক্ষয়জনিত রোগের চিকিৎসা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। এবার বিজ্ঞানীরা এমন একটি প্রোটিন শনাক্ত করেছেন, যা এই রোগগুলোর সঙ্গে জড়িত ক্ষতিকর প্রোটিন জমাট বাঁধা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন এই আবিষ্কার ভবিষ্যতে নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।

সম্প্রতি বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনস-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, টিউবুলিন নামের একটি প্রোটিন মস্তিষ্কের কোষকে ক্ষতিকর প্রোটিনের আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।

আলজেইমার রোগে সাধারণত টাউ প্রোটিন অস্বাভাবিকভাবে জমাট বাঁধে। অন্যদিকে পারকিনসন রোগে আলফা-সিনিউক্লিন নামের প্রোটিনের ক্ষতিকর সঞ্চয় দেখা যায়। এই প্রোটিনগুলো স্বাভাবিক গঠন হারিয়ে একত্রিত হলে মস্তিষ্কে বিষাক্ত স্তূপ তৈরি হয়, যা স্নায়ুকোষের ক্ষতি করে।

এর ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, চিন্তা করার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া, হাত-পায়ের চলাচলে সমস্যা এবং অন্যান্য স্নায়বিক জটিলতা দেখা দেয়।

বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের গবেষকদের মতে, টিউবুলিন এই ক্ষতিকর প্রক্রিয়াকে থামাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

টিউবুলিন সাধারণত কোষের ভেতরে মাইক্রোটিউবুল নামের সূক্ষ্ম কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এসব কাঠামো কোষের ভেতরে পরিবহন ব্যবস্থা ও গঠনগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

গবেষণায় দেখা গেছে, টিউবুলিন শুধু কাঠামোগত কাজই করে না, এটি টাউ ও আলফা-সিনিউক্লিনের আচরণও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। মস্তিষ্কের কোষে থাকা ক্ষুদ্র তরলসদৃশ অংশ বা কন্ডেনসেটস-এর মধ্যে প্রবেশ করে টিউবুলিন এসব প্রোটিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। ফলে টাউ ও আলফা-সিনিউক্লিন ক্ষতিকর স্তূপে পরিণত না হয়ে স্বাভাবিক ও কার্যকর অবস্থায় থাকতে পারে।

গবেষণার প্রধান লেখকদের একজন এবং বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ড. রাম বিশ্নোই বলেন, টিউবুলিনের উপস্থিতি আসলে একটি আণবিক সুইচের মতো কাজ করে, যা নির্ধারণ করে সংশ্লিষ্ট প্রোটিনগুলো উপকারী থাকবে নাকি ক্ষতিকর হয়ে উঠবে।

গবেষকরা পরীক্ষাগারে কোষের মধ্যে টিউবুলিনের মাত্রা কমিয়ে দেখেন, তখন টাউ ও আলফা-সিনিউক্লিন দ্রুত জমাট বাঁধতে শুরু করে। একই সঙ্গে স্নায়ুকোষের ক্ষতির লক্ষণও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এতে বোঝা যায়, টিউবুলিন শুধু একটি সহায়ক প্রোটিন নয়; বরং এটি মস্তিষ্কের কোষকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।

এতদিন গবেষণার বড় অংশ ছিল ক্ষতিকর প্রোটিনের স্তূপ ধ্বংস বা অপসারণের দিকে। কিন্তু নতুন গবেষণা ভিন্ন একটি ধারণা সামনে এনেছে।

গবেষকদের মতে, সমস্যার সমাধান শুধু ক্ষতিকর প্রোটিন সরিয়ে ফেলা নয়; বরং এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে স্বাস্থ্যকর প্রোটিনগুলো স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। অর্থাৎ, লক্ষ্য হতে পারে টিউবুলিনের মাত্রা এমনভাবে বজায় রাখা, যাতে ক্ষতিকর জমাট বাঁধা শুরুই না হয়।

ড. বিশ্নোই বলেন, “প্রশ্নটি আর শুধু টাউ প্রোটিনের স্তূপ কীভাবে ভাঙা যায় তা নয়। বরং কীভাবে টিউবুলিনকে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থায় রাখা যায়, যাতে ক্ষতিকর স্তূপ তৈরি হওয়ার সুযোগ না পায়।”

তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এই গবেষণা এখনো পরীক্ষাগার ও কোষভিত্তিক পর্যায়ে রয়েছে। প্রাণী ও মানুষের ওপর আরও গবেষণা না হওয়া পর্যন্ত এটিকে চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো, মাইক্রোটিউবুল ও টিউবুলিন শরীরের প্রায় সব কোষেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এগুলোকে লক্ষ্য করে নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ তৈরি করা সহজ হবে না।

তবুও গবেষকরা মনে করেন, এই আবিষ্কার আলজেইমার ও পারকিনসনের মতো রোগ সম্পর্কে নতুন বোঝাপড়া তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতের চিকিৎসা গবেষণার জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ আলজেইমার ও পারকিনসনের মতো রোগে আক্রান্ত। বর্তমানে এসব রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের কোনো কার্যকর উপায় নেই। তাই টিউবুলিনের সুরক্ষামূলক ভূমিকা নিয়ে এই নতুন আবিষ্কার গবেষকদের কাছে আশার বার্তা হয়ে এসেছে।

বিজ্ঞানীদের ভাষায়, ভবিষ্যতের চিকিৎসা কৌশল হয়তো ক্ষতিকর প্রোটিন ধ্বংস করার বদলে স্বাস্থ্যকর প্রোটিনকে শক্তিশালী করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে। আর সেই পথেই টিউবুলিন হয়ে উঠতে পারে নতুন এক সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু।

সূত্র :  নিউজ উইক 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *