বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অভিজ্ঞতা বিনিময় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ। জর্জিয়ার তিবিলিসিতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের জাতিসংঘ পাবলিক সার্ভিস ফোরামে (UNPSF) আন্তঃআঞ্চলিক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ১২টি দেশের পক্ষে স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এ আহ্বান জানান।
বিশেষ অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ককেশাস, মধ্য এশিয়া ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক অংশীদারিত্ব ডিজিটাল অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার, দেশটির স্বরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল ইনফরমেশন সোসাইটি এজেন্সি, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এবং আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল রূপান্তরের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল অর্জনে ব্যর্থ হয়। এই ঝুঁকি কমাতে দেশগুলোর মধ্যে সফল অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির কোনো বিকল্প নেই। পিয়ার-টু-পিয়ার সহযোগিতা এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা শুধু উন্নয়নের অংশ নয়, বরং উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
২০২৬ সালের UNPSF-এর মূল প্রতিপাদ্য ‘ট্রান্সফর্মিং পাবলিক ইন্সটিটিউশনস : এডভান্সিং ইনোভেশন, একাউন্টেবিলিটি, পার্টিসিপেশন এন্ড ইনক্লুশন ’ নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী উদ্ভাবন, জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারি সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, নাগরিক-কেন্দ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে সরকারি সেবা আরও সহজ ও কার্যকর করার কাজ চলছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ‘সার্ভিস ডেলিভারি ম্যাচিউরিটি মডেল’ এবং সরকারি কার্যক্রমে আরও দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য ‘প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি’ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, শুধু প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়, সরকারি কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন এবং রূপান্তরমূলক নেতৃত্ব তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, জনসেবার মান ও দক্ষতা বাড়াতে এআই বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে একই সঙ্গে এআই ব্যবহারে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে ইউএনডিপির সঙ্গে যৌথভাবে জনসেবা, নীতি নির্ধারণ ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি দায়িত্বশীল এআই ব্যবহার, পক্ষপাতহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির বিষয়েও কাজ চলছে।
ফোরামের পাশাপাশি মন্ত্রী কম্বোডিয়ার ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এইচ.ই. ভ্যানডেথ চেয়া, আজারবাইজানের ASAN ইনোভেশন সেন্টার -এর নির্বাহী পরিচালক ভুসাল রুস্তমভ এবং কাজাখস্তানের আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাবের চেয়ারম্যান আলিখান বাইমেনভের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের এটুআই উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিক-কেন্দ্রিক ডিজিটাল সেবার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার ভিত্তিক ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
আজারবাইজানের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির সফল ‘ASAN সার্ভিস’ মডেল এবং বাংলাদেশের ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একটি কাঠামোগত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা গড়ে তোলার বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। এর মাধ্যমে নাগরিক-কেন্দ্রিক সেবা এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
কম্বোডিয়ার সঙ্গে আলোচনায় প্রান্তিক পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি কাজে এআই ব্যবহারের জন্য একটি যৌথ কাঠামো তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। ইউএনডিপি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আওতায় জ্ঞান বিনিময় ও স্টাডি ভিজিট পরিচালনার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কাজাখস্তানের আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাবের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন ‘উদ্ভাবন সংস্থা’ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সংস্থা গবেষণা, উদ্ভাবন এবং সরকারি কর্মকর্তাদের আধুনিক নেতৃত্ব তৈরিতে সহায়তা করবে।
ফোরামে অংশগ্রহণকারী ১২টি দেশের পক্ষ থেকে মন্ত্রী পারস্পরিক শেখা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং যৌথ অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে একটি ফলপ্রসূ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।