এক সময় বিশ্বের ক্ষমতার কেন্দ্র নির্ধারণ করত তেল। মধ্যপ্রাচ্যের তেলভাণ্ডার ঘিরে গড়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক জোট, সংঘাত ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ। এখন সেই জায়গা দখল করছে আরেকটি খনিজ—লিথিয়াম। বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে লিথিয়ামকে বলা হচ্ছে একুশ শতকের ‘সাদা স্বর্ণ’।
এই মূল্যবান খনিজকে ঘিরে নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার একটি অঞ্চল, যা বিশ্বজুড়ে পরিচিত ‘লিথিয়াম ত্রিভুজ’ নামে।
লিথিয়াম ত্রিভুজ গঠিত হয়েছে আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও চিলির সীমান্তবর্তী উচ্চভূমি অঞ্চল নিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে বলিভিয়ার স্যালার দে উয়ুনি, চিলির আতাকামা মরুভূমির লবণাক্ত এলাকা এবং আর্জেন্টিনার স্যালার দেল ওমব্রে মুয়ের্তো।
শুষ্ক আবহাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ লবণাক্ত পানির কারণে এই এলাকাগুলো থেকে তুলনামূলক কম খরচে লিথিয়াম উত্তোলন করা সম্ভব। ফলে অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের পরিচিত লিথিয়াম সম্পদের প্রায় ৪৩ শতাংশ এই তিন দেশের হাতে রয়েছে। আর্জেন্টিনায় প্রায় ২৮ মিলিয়ন টন, বলিভিয়ায় ২৩ মিলিয়ন টন এবং চিলিতে ১৩ মিলিয়ন টন লিথিয়াম সম্পদ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
যদিও তিন দেশই বিপুল লিথিয়াম সম্পদের মালিক, উৎপাদনের ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান এক নয়।
২০২৫ সালে চিলি প্রায় ৫৬ হাজার টন লিথিয়াম উৎপাদন করে অঞ্চলের শীর্ষ উৎপাদক হিসেবে অবস্থান ধরে রাখে। আর্জেন্টিনার উৎপাদন ছিল ২৩ হাজার টন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে বিশ্বের অন্যতম বড় লিথিয়াম ভাণ্ডারের মালিক হওয়া সত্ত্বেও বলিভিয়ার উৎপাদন ছিল মাত্র ৩ হাজার ৫০০ টন।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং নীতিগত পার্থক্যের কারণে এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে।
গত এক দশকে লিথিয়াম ত্রিভুজে সবচেয়ে সক্রিয় বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।
আর্জেন্টিনায় চীনা প্রতিষ্ঠান গানফেং লিথিয়াম শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নতুন উৎপাদন প্রকল্প চালু করেছে। বলিভিয়ায় চীনা কোম্পানিগুলোর একটি কনসোর্টিয়াম উয়ুনি অঞ্চলে বড় আকারের বিনিয়োগ চুক্তি করেছে। চিলিতেও চীনা কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ খনি প্রকল্পে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে।
চীনের লক্ষ্য শুধু খনিজ উত্তোলন নয়। দেশটি খনি থেকে শুরু করে পরিশোধন, ব্যাটারি উৎপাদন এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্প পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়।
লিথিয়ামকে এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রও।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন আর্জেন্টিনার সঙ্গে খনিজ সম্পদ ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করেছে। দুই দেশ একাধিক সমঝোতা ও সহযোগিতা চুক্তি করেছে, যার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু লিথিয়াম।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে বলিভিয়ায় চীনা ও রুশ কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বেশি হওয়ায় সেখানে আমেরিকার প্রভাব সীমিত।
লিথিয়ামের গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াও এই অঞ্চলে বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে।
তাদের লক্ষ্য হলো ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য কাঁচামাল নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো।
ফলে লিথিয়াম ত্রিভুজ এখন শুধু একটি খনিজ অঞ্চল নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতার মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
তবে লিথিয়ামের এই উত্থানের একটি অন্ধকার দিকও রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ও আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো অভিযোগ করছে, ব্যাপক খনন কার্যক্রম ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি করছে। তাদের আশঙ্কা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির নামে উন্নত দেশগুলো নিজেদের পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণ করলেও এর সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য দিতে হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে।
অন্যদিকে সরকার ও খনি কোম্পানিগুলো বলছে, বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের জন্য লিথিয়াম অপরিহার্য।
বিশ্বজুড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও জ্বালানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির চাহিদা বাড়তে থাকায় আগামী বছরগুলোতে লিথিয়ামের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশগুলো কি তাদের বিপুল লিথিয়াম সম্পদকে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে, নাকি অতীতের মতো আবারও কাঁচামাল রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির ফাঁদে আটকে যাবে?
লিথিয়াম ত্রিভুজের ভবিষ্যৎ শুধু আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া ও চিলির জন্য নয়; বরং বিশ্বের সবুজ জ্বালানি অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আজকের ‘সাদা স্বর্ণ’ আগামী দিনের বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে কতটা ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।