লিম তিয়ান
ব্রিটেন তার প্রধানমন্ত্রীদের হারাতেই থাকবে—যত দিন না দেশটি একটি কঠিন বাস্তবতা স্বীকার করে। আর সেই বাস্তবতা হলো, ইউরোপের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে।
ব্রেক্সিটের অভিশাপ কোনো রাজনৈতিক মতামত নয়, কোনো দলীয় বিতর্কও নয়। এটি ভূগোল, ইতিহাস ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কঠিন বাস্তবতার ফল। গত এক দশকে ব্রিটেনের ছয়জন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক পতন যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এক দশকে ব্রিটেন পেল ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। আধুনিক কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটি অস্বাভাবিক এক রাজনৈতিক অস্থিরতার চিত্র। ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, রিশি সুনাক ও কিয়ার স্টারমার—ছয় নেতা, ছয়টি রাজনৈতিক সংকট। কিন্তু তাদের ব্যর্থতার পেছনে মূল সমস্যাটি একই।
ব্রিটেন আসলে নেতৃত্বের সংকটে নয়, বরং পরিচয়, উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণের সংকটে ভুগছে।
স্টারমারের পদত্যাগের খবর প্রকাশের আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন যে স্টারমার পদত্যাগ করতে পারেন। একসময় যে ব্রেক্সিটকে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছিল, আজ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতিতে একের পর এক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক সংকটে পড়ছেন।
ঘটনাটির মধ্যে যেন শেক্সপিয়রের কোনো ট্র্যাজেডির ছায়া আছে।
ট্রাম্প যে ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন, সেই রাজনৈতিক প্রকল্পই আজ ব্রিটেনের জন্য এক দীর্ঘ অস্থিরতার চক্র তৈরি করেছে। স্টারমার সেই চক্রের সর্বশেষ শিকার।
আমার বক্তব্য খুব সরল—ব্রিটেন আরও বহুবার প্রধানমন্ত্রী বদলাতে পারে, যত দিন না তারা ব্রেক্সিট-পরবর্তী বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।
এক সময় ব্রিটেনের রাজনীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইতালির মতো হয়ে উঠতে পারে, যেখানে সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতো না। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটবে তখনই, যখন ব্রিটেন বুঝবে তার অস্থিরতার মূল কারণ কোথায়। এটি কোনো দলীয় যুক্তি নয়। এটি একটি কাঠামোগত বাস্তবতা। ইউরোপ ছাড়া ব্রিটেন যেন এমন একটি জাহাজ, যার নোঙর ছিঁড়ে গেছে। জাহাজটি এখনো চলছে, কিন্তু তার সামনে নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই।
ব্রেক্সিট-পরবর্তী ব্রিটেনকে দেখলে মনে হয়, একটি বিশাল সমুদ্রজাহাজ তার পুরোনো নোঙর হারিয়েছে। সে এখনো ডুবছে না। তার ইঞ্জিন চলছে। তার নাবিকেরা দক্ষ। কিন্তু সমস্যা হলো—তার সামনে কোনো নির্দিষ্ট বন্দর নেই, নেই পরিষ্কার মানচিত্র।
২০১৬ সালের পর থেকে প্রতিটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এই দিকহীন জাহাজকে পথ দেখানোর চেষ্টা করেছেন। কেউ সফল হননি। এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়। মূল সমস্যা হলো, একটি দেশ যখন নিজের পরিচয় ও ভবিষ্যৎ পথ নিয়ে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন কোনো একক নেতা সহজে সেই সংকট সমাধান করতে পারেন না।
ব্রেক্সিট শুধু বাণিজ্যিক কাঠামো পরিবর্তন করেনি। এটি ব্রিটেনকে সেই রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো থেকেও বিচ্ছিন্ন করেছে, যার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেশটি সাম্রাজ্য-পরবর্তী পরিচয় খুঁজে পেয়েছিল। সেই কাঠামো ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিটি প্রধানমন্ত্রী একই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন।
ব্রিটিশ বিশ্লেষকেরা অনেক সময় একটি বিষয় উপেক্ষা করেন—ব্রিটেনকে বাইরের পৃথিবী কীভাবে দেখে।
সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার একজন মানুষ যখন ইউরোপের কথা ভাবেন, তখন তার মনে প্রথম যে শহরটি আসে, তা হলো লন্ডন। এটি কোনো ভুল ধারণা নয়। এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানসিক ভূগোলের স্বাভাবিক ফল। লন্ডন ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী।ইংরেজি ভাষা ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রধান বাহন। ব্রিটিশ সংসদীয় গণতন্ত্র, কমন ল, সাহিত্য, সংগীত ও শিল্প—সবই ইউরোপীয় সভ্যতার অংশ। প্যারিস, রোম বা ভিয়েনার মতো লন্ডনও ইউরোপের প্রতিনিধিত্ব করে।
আমার প্রজন্মের বহু সিঙ্গাপুরীয় ও মালয়েশিয়ান ব্রিটিশ শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে বড় হয়েছে। তাদের কাছে ব্রিটেন ইউরোপের পাশের কোনো দেশ নয়। ব্রিটেন নিজেই ইউরোপ। ব্রেক্সিট শুধু অর্থনীতিকে প্রভাবিত করেনি, এটি মানুষের মানসিক মানচিত্রকেও বদলে দিয়েছে।
ঘটনাটি যেন এমন—ফ্রান্স ঘোষণা করল সে আর পশ্চিমা বিশ্বের অংশ নয়, কিংবা জাপান জানিয়ে দিল পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্ক নেই। ব্রেক্সিটের বিস্ময় মূলত অর্থনৈতিক নয়, পরিচয়ের প্রশ্নে।
ব্রেক্সিটের ট্র্যাজেডি আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা যুদ্ধ-পরবর্তী ব্রিটেনের অন্যতম সফল কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড ম্যাকমিলানের কথা স্মরণ করি। ষাট বছরেরও বেশি আগে তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যেই নিহিত।
লি কুয়ান ইউয়ের স্মৃতিকথায় ষাটের দশকের সেই সময়কার রাজনৈতিক আলোচনা উঠে এসেছে। কমনওয়েলথ নেতাদের বৈঠক এবং ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে (ইইসি) যোগদানের প্রশ্নে তখন তীব্র বিতর্ক চলছিল।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট মেনজিসসহ অনেক কমনওয়েলথ নেতা আশঙ্কা করেছিলেন, ব্রিটেন ইউরোপে গেলে ঐতিহাসিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়বে।
কিন্তু ম্যাকমিলান ছিলেন বাস্তববাদী। তিনি বুঝেছিলেন, অতীতের সাম্রাজ্যিক সম্পর্ক ধরে রেখে ভবিষ্যৎ নির্মাণ সম্ভব নয়। ব্রিটেনের দরজার কাছেই যে মহাদেশ, তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই হতে পারে বাস্তব পথ। তিনি জানতেন, ইউরোপের দিকে এগিয়ে যাওয়া ব্রিটেনের অতীতকে অস্বীকার করা নয়; বরং ভবিষ্যৎকে গ্রহণ করা।
১৯৬৩ সালে ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গল ব্রিটেনের সদস্যপদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষার পর ১৯৭৩ সালে কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ব্রিটেনকে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায়ে নিয়ে যান। হিথ ছিলেন ব্রিটেনের ইতিহাসের অন্যতম ইউরোপপন্থী নেতা। তিনি বুঝেছিলেন, সাম্রাজ্য-পরবর্তী ব্রিটেনকে নতুন পরিচয় খুঁজে নিতে হবে ইউরোপকে ঘিরেই।
কিন্তু ইতিহাসের বিস্ময় হলো—যে দল ব্রিটেনকে ইউরোপে নিয়ে গিয়েছিল, সেই কনজারভেটিভ পার্টির পরবর্তী প্রজন্মই ধীরে ধীরে ইউরোপ প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আশির দশকে আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম। তখন খুব কাছ থেকে দেখেছি এই দ্বন্দ্বের শুরু। ইউরোপ প্রশ্ন ব্রিটিশ রাজনীতির কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে উঠেছিল। মন্ত্রীরা পদত্যাগ করতেন। সংসদে বিতর্ক হতো। টেলিভিশনে চলত তীব্র আলোচনা।
শেষ পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব আঘাত করেছিল মার্গারেট থ্যাচারকে। তিনবার নির্বাচনে জয়ী, শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় থাকা এই নেত্রীও ইউরোপ প্রশ্নে নিজের দলের বিরোধিতার মুখে ১৯৯০ সালে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। কনজারভেটিভ পার্টি সেই শিক্ষা গ্রহণ করেনি। জন মেজরের সময়েও ইউরোপ নিয়ে দলীয় বিভক্তি চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের গণভোটের সিদ্ধান্ত ব্রিটেনকে নতুন এক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
ন্যায়ের খাতিরে বলতে হবে, ক্যামেরন হঠাৎ করে গণভোট ডাকেননি। নাইজেল ফারাজ ও ইউকিপের উত্থান, অভিবাসন প্রশ্ন এবং ইংরেজ জাতীয়তাবাদী রাজনীতির চাপ তাকে উদ্বিগ্ন করেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, গণভোটের মাধ্যমে এই বিতর্কের স্থায়ী সমাধান হবে।কিন্তু তিনি ভুল করেছিলেন। তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ইউরোপের পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থান না নেওয়া।
ম্যাকমিলানের মতো দূরদর্শিতা কিংবা হিথের মতো ইউরোপের প্রতি বিশ্বাস তার ছিল না। তিনি ইউরোপের পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন মূলত অর্থনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে। কিন্তু পরিচয় ও আবেগের রাজনীতির বিরুদ্ধে শুধু অর্থনৈতিক যুক্তি অনেক সময় যথেষ্ট হয় না।তিনি পরাজিত হলেন। আর সেই পরাজয় ব্রিটেনকে এমন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার পথে নিয়ে গেল, যার শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সমাধানটি বলা সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন। ব্রিটেনকে আবার ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে হবে। তবে তা আগামীকাল সম্ভব নয়। ব্রেক্সটের রাজনৈতিক ক্ষত এখনো গভীর। বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি এখনো শক্তিশালী। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
প্রতিটি ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী ব্রিটেনকে আরও বেশি করে সেই প্রশ্নের মুখোমুখি করবে—ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া ভবিষ্যৎ কী?অর্থনৈতিক তথ্য জমা হচ্ছে। ইউরোপের সঙ্গে তুলনা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। অভিবাসন সংকটও সমাধানহীন রয়েছে।
১০ ডাউনিং স্ট্রিট যেন এখন এক রাজনৈতিক ঘূর্ণির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ব্রিটেনকে অর্থনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। বড় বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে দূরত্ব রেখে তা কঠিন।
ব্রিটেনকে নতুন জাতীয় উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু সেই উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া কঠিন, যত দিন তার রাজনীতি শুধু বিচ্ছিন্নতার সিদ্ধান্তকে ঘিরে থাকবে। ষাট বছর আগে ম্যাকমিলান এই বাস্তবতা বুঝেছিলেন। এডওয়ার্ড হিথ তার জন্য লড়েছিলেন।
ইতিহাস বারবার একই শিক্ষা দিয়েছে। কিন্তু ছয়জন প্রধানমন্ত্রীও সেই শিক্ষা এখনো যথেষ্ট স্পষ্ট করে দিতে পারেননি। হয়তো আরও অনেক প্রধানমন্ত্রী লাগবে।
ব্রিটেনের জায়গা কোথায়—ইতিহাস ও ভূগোল তার উত্তর দিয়ে দিয়েছে। ব্রিটেন ইউরোপের অংশ। যত দিন না সে সেই বাস্তবতার সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক গড়ে তুলবে, তত দিন রাজনৈতিক অস্থিরতার এই চক্র চলতেই থাকবে।